হরিজন সম্প্রদায়: বৈষম্যের মাঝে বেড়ে ওঠা এই মানুষগুলো এখন কোথায় যাবেন
'উচ্ছেদ' শব্দটির সাথেই জড়িয়ে আছে কষ্ট, ভয়, উৎকণ্ঠা, বঞ্চনা আর অসম্মান। ঠিক এরকমই দুঃখজনক এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন স্যা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন কোয়ার্টারে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়।
অন্যান্য সময় সামাজিক অবজ্ঞা ও রাষ্ট্রের উদাসীনতায় যে মানুষগুলো মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হন, আজ তাদের সামনেই এসে দাঁড়িয়েছে এই উচ্ছেদ আতঙ্ক।
সমাজের চোখে 'অচ্ছুত' হয়ে তাদের জীবন কাটে নানা বৈষম্য ও অবহেলার মধ্যে। সম্প্রতি মিটফোর্ড হাসপাতাল সংলগ্ন কোয়ার্টারে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়কে পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৬৮ বছর ধরে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে হরিজন পরিবারগুলো এখানে বাস করছেন। ফলে তারা নিজেদের জন্য বিকল্প কোনো আবাসন ব্যবস্থা গড়ার কথা ভাবেননি।
অবশ্য সুইপার কলোনির বাসিন্দাদের এই উচ্ছেদ আতঙ্ককে খুব গুরুত্বহীনভাবে দেখছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা মনে করেন, পূর্বপুরুষের চাকরির সূত্র ধরে বর্তমান প্রজন্মের সদস্যদের সরকারি কোয়ার্টারে বসবাসের অধিকার থাকতে পারে না। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জায়গার সংকট থাকায় তাদের পুনর্বাসনেরও কোনো সুযোগ নেই।
মূলধারার মানুষের জন্য কর্তৃপক্ষের এই যুক্তি আংশিক সত্য হলেও, সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থাকা হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য এটা কার্যকর নয়, বরং অন্যায় ও রুঢ় আচরণ। সামাজিক পরিচয় ও পেশার কারণে এই মানুষগুলোকে দীর্ঘদিন সমাজের প্রান্তে ঠেলে রাখা হয়েছে।
আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে বাংলাদেশেও জাতভেদ আছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি সমাজে বৈষম্য প্রকট। গল্পের মতো শোনালেও, সত্যি যে এই মানুষগুলো জাত প্রথার কারণে নিগৃহীত হচ্ছেন হোটেলে খেতে গিয়ে, কারো বাসায় নিমন্ত্রণে ও স্কুলে পড়তে গিয়ে। দলিত-হরিজন শিশুদের সাথে একই বেঞ্চিতে অন্য শিশুরা বসতে চায় না, এক গ্লাসে পানি পান করে না।
আমরা কি জানি সুইপারের ছেলে বলে, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের দিন তাকে দিয়েই প্রধান শিক্ষক স্কুলের টয়লেট পরিস্কারের কাজ করিয়েছিল? সম্ভবত ঘটনাটি যশোর বা সাতক্ষীরার। এই ঘটনায় এলাকায় জনরোষ তৈরি হয়েছিল।
এমনকি মারা গেলেও হরিজনরা বৈষম্যের শিকার হন। বাংলাদেশেই এমন এলাকা আছে, যেখানে হরিজনদের মূল শ্মশানে না নিয়ে আলাদা শ্মশানে দাহ করা হয়। যে চিতায় উচ্চবংশীয়রা পুড়বে, সেই চিতায় নিম্নবর্ণের মানুষের জায়গা হবে কেন?
এখনো বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের দাওয়াত দিলে মাটিতে কলাপাতায় করে খেতে দেওয়া হয়, পানি দেওয়া হয় মাটির বদনায়। খাওয়ার পর নিজেদেরই সেই জায়গা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে হয়। আমাদের কাছে এসব অবিশ্বাস্য মনে হলেও, পরিস্থিতি আসলে এমনই। অথচ ক্ষমতাহীন এই মানুষগুলো প্রতিবাদ করতে পারে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এরকম একটা সামাজিক অবস্থানে বেঁচে থাকা হরিজন সম্প্রদায়ের মূল্য খুব সামান্যই। তাই তাদের ভয়, দেড়শ বছরের এই বাসস্থান হারালে, তারা যাবেন কোথায়? কী হবে তাদের ঠিকানা? মিটফোর্ডের হরিজনেরা সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন। তারা জানেন হরিজন সম্প্রদায়ের কেউ অন্যত্র বাসা পাবেন না। বাড়িওয়ালা যখনই শোনে ভাড়াটিয়া হরিজন, অমনি নানা অজুহাতে না করে দেয়।
তাই কলোনির বাসা খালি করার নোটিশ পাওয়ার পর থেকেই তাদের দিন কাটছে আতঙ্কে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোথায় যাবেন, তার কোনো উত্তর তাদের জানা নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নারী, শিশু কিংবা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই সাংবিধানিক সুযোগ ব্যবহার করে রাষ্ট্র কি এই প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন ও বিকল্প ব্যবস্থার পথ তৈরি করবে? নাকি কোনো কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত না করেই এই ঠিকানা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হবে?
এই হরিজনরা হলো প্রান্তিক ও অবাঙালি দলিত সম্প্রদায়, যাদের ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শহর ও জনপদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজের জন্য এ দেশে আনা হয়েছিল। ১৮৫৮ সালে মিটফোর্ড হাসপাতাল চালুর সময় থেকেই এর পরিচ্ছন্নতা রক্ষার দায়িত্ব পড়ে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর। শুধু অবাঙালি দলিত হরিজন নন; দেশে স্থানীয় দলিতরাও আছেন। সেই বাঙালি দলিতরাও অচ্ছুত ও অস্পৃশ্য।
কর্মসূত্রেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে এসব মানুষের বসতি। নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে আসা এই মানুষগুলোর পরবর্তী প্রজন্মও থেকে যায় এখানে। বংশ পরম্পরায় পরিচ্ছন্নতার কাজই করে এসেছেন তারা। পরে অন্যান্য হিন্দু ও মুসলমানরাও এই পেশায় যোগ দিয়েছেন। খুব দরিদ্র এই মানুষগুলো পুনর্বাসনের জন্য খুব বেশি কিছু চান না, শুধু একটা আশ্রয় চাইছেন, যেখান থেকে অচ্ছুত বলে কেউ তাদের বের করে দেবে না।
আমাদের শহরগুলো প্রতিদিন পরিষ্কার রাখার পেছনে যে সম্প্রদায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের জীবনটা কিন্তু সুখের নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত থেকেও হরিজন সম্প্রদায় এখনও সামাজিক বৈষম্য, আবাসন সংকট ও মজুরি বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করছেন। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য হরিজনদের জীবনকে অনেক কঠিন করে তুলেছে।
এদেশে অধিকাংশ হরিজন খাসজমিতে গড়ে ওঠা কলোনিতে বসবাস করেন। সরকারি অফিস, রেলওয়ে বা হাসপাতালের প্রয়োজনেই একসময় তাদের এনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশে রাখা হয়েছে। অথচ যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে তাদের ওপরেই চলে উচ্ছেদ অভিযান।
ভূমিহীন ও নিজস্ব বসতভিটাহীন হরিজন সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সরকার প্রদত্ত জমি, রেলস্টেশনসহ সরকারি খাসজমিতে শুধু বসবাস করেন। আর তাই উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের নামে পুনর্বাসন ছাড়া তাদের উচ্ছেদ করা খুব সহজ হয়। যেমনটা হয়েছে সলিমুল্লাহ হাসপাতালের সুইপার কলোনির ক্ষেত্রে।
অনেকে ভাবেন এই পেশায় এত অবমাননা, তাও কেন এই পেশা ছেড়ে ছেলে-মেয়েরা অন্য পেশায় যায় না? আসলে এরা যেতে পারেন না। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য থাকে না অধিকাংশের। মূলধারার স্কুল-কলেজে এদের ভর্তিও নিতে চায় না। তাও যদি বা কষ্ট করে পাশ করে কিন্তু ভালো চাকরি পায় না।
রাজকুমার খুব কষ্ট করে বিএ পাশ করেছিল। ইচ্ছা ছিল স্কুলের শিক্ষক হবেন। কিন্তু সুইপারের ছেলে বলে তাকে চাকরি দেওয়া হয়নি। রাজকুমার নিজ এলাকায় একটা মুদির দোকান দিয়েছিল শেষপর্যন্ত। কারণ অন্য জায়গায় দোকান দিলে সেখানে মানুষ খেতে চাইবে না। এমন অভিজ্ঞতা ও আশঙ্কা বহু মানুষকে একই পেশার গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখে।
মনিলতাকে আমি চিনতাম কাজের সূত্রে। ওর পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছা দেখে বিভিন্নভাবে ওকে সহায়তা করা হয়েছিল। মেয়েটি এমএ পাশ করেছিল, ঢাকার এক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু চাকরি পায়নি কোথাও। পরে এলাকাতেই শিশুদের পড়াতো। একদিন ফোন করে জানালো বিয়ে করে ভারতে চলে যাচ্ছে।
এই মানুষগুলোর কাছ থেকে আমরা, যারা নিজেদের ভদ্র বলে মনে করি, তারা প্রতিনিয়ত সেবা নেই ঠিকই, কিন্তু তাদের স্পর্শ করি না। এদের পাশে বসলে, স্পর্শ করলে, ভালো করে কথা বললে, একই সেলুন, রেঁস্তোরায় গেলে আমাদের সম্মান নষ্ট হয়। সোজা কথায় আমরা তাদের ঘৃণা করি। কী সাংঘাতিক জাত প্রথা ও বৈষম্য।
ওই সম্প্রদায়ের একজন প্রবীণ ব্যক্তি বলেছেন, ''দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতে অনেকের মাথায় এমন ধারণা ঢুকে গেছে যে, আমরা হয়তো সত্যিই নিচু জাতি। সমাজ যেভাবে আমাদের উপস্থাপন করেছে, একসময় আমরা নিজেরাই সেভাবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছি।''
বলা হয়, এসব 'অচ্ছুত' মানুষকে সম্মানজনক অবস্থান দেওয়ার জন্য মহাত্মা গান্ধী তাদের নাম দিয়েছিলেন হরিজন, মানে ঈশ্বরের সন্তান। সেই ঈশ্বরের সন্তানদের সঙ্গে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্র ও সমাজ কী ধরনের আচরণ করছে তা আমরা দেখছি। শুধু পেশার কারণে এই মানুষগুলো সবদিক দিয়ে প্রান্তিক অবস্থানে আছেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের সামাজিক অবস্থান, জীবিকা এবং পুনর্বাসনের কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে কোনো প্রান্তিক মানুষ যেন গৃহহীন হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়।
এই ধররের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই দলিত হরিজনদের জন্য একটা স্থায়ী কমিশন গঠন করা দরকার। তাদের দায়িত্ব হবে প্রান্তিক জনগণের সব ধরনের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। রাষ্ট্রেরই বড় দায়িত্ব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা দিয়ে টেনে নিয়ে এসে, মূলধারার পাশে দাঁড় করানো, যেন মানুষগুলো সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
