‘আমরা কোথায় যাব?’: মিটফোর্ডের হরিজন পরিবারগুলোর কাছে উচ্ছেদ মানে ঘর হারানোর চেয়েও বেশি কিছু
সুইপার কলোনির এই বাড়ি আম্বিকার (৯) খুব পছন্দের। এখানে তার অনেক বন্ধু। প্রতিদিন সবাই মিলে স্কুলে যায় ওরা। স্কুল শেষে বাড়ির ছোট্ট উঠোনটাই হয়ে ওঠে ওদের খেলাঘর। ওদের ছুটাছুটি, হৈ-হুল্লোড়ে আর খুনসুটিতে মুখর থাকে পুরো বাড়ি।
তবে কয়েক দিন ধরে সেই চেনা আনন্দে যেন ভাটা পড়েছে। আম্বিকাসহ তার বন্ধুদের কারও মন ভালো নেই। তারা জেনে গেছে, তাদের এই বাড়ি ভেঙে ফেলার কথা চলছে। বড়রা বিষয়টি নিয়ে ওদের সামনে কথা বলেন না। তবুও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে ওরা।
বাড়িটা সত্যিই ভেঙে ফেললে ওরা যাবে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর আম্বিকার জানা নেই। তার বন্ধুদেরও নয়। 'উচ্ছেদ' অর্থও হয়তো জানে না ওরা। শুধু বুঝেছে, যে বাড়িতে জন্মেছিল, যেখানে এতদিন আনন্দে কেটেছে জীবন, সেটি হয়তো আর থাকবে না।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে সুইপার কলোনির বাসিন্দাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে চরম এক অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি তাদের দেড় শতাব্দীর বাসস্থান উচ্ছেদে নোটিশ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে হাসপাতাল প্রাঙ্গণই তাদের ঠিকানা, যে মাটিতে তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, শ্রম আর সংগ্রাম মিশে আছে, ১৬৮ বছরের সেই চেনা ঠিকানা ছেড়ে কোথায় যাবেন তারা?
সুইপার কলোনির হরিজনেরা
মিটফোর্ড হাসপাতালের পুরনো ভবনগুলোর একটি পরিচিত 'সুইপার কলোনি' বা মিনিয়াডস কোয়ার্টার নামে। এই নাম আজকের দেওয়া নয়।
ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের ঢাকা। চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। তৎকালীন কালেক্টর রবার্ট মিটফোর্ড বুড়িগঙ্গার তীরে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। মৃত্যুর আগে নিজের সম্পত্তির একটি অংশ উইল করে যান এই হাসপাতালের জন্য। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৮৫৮ সালের ১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে মিটফোর্ড হাসপাতাল। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রথম আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল।
হাসপাতাল চালুর সেই সময় থেকেই এর পরিচ্ছন্নতা রক্ষার দায়িত্ব পড়ে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর। ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই কাজের জন্য তাদের আনা হয়। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা, হাসপাতালের চারপাশসহ শহর পরিচ্ছন্ন রাখাই ছিল তাদের কাজ।
কর্মসূত্রেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে এসব মানুষের বসতি। নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে আসা এই মানুষগুলোর পরবর্তী প্রজন্মও থেকে যায় এখানে। সেই থেকে বংশ পরম্পরায় পরিচ্ছন্নতার কাজই করে এসেছেন তারা। তাই তাদের বসতি পরিচিত হয়ে ওঠে 'সুইপার কলোনি' নামে।
কলোনির ভেতরে এখন জায়গা খুব বেশি নেই। ইংরেজি এল আকৃতির দোতলা ভবনটি ঢাকায় ব্রিটিশ আমলে নির্মিত অন্যান্য পুরোনো ভবনের মতোই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাল ইটের দেয়াল, সরু সিঁড়ি আর মাঝখানের ছোট্ট উঠোন ঘিরেই এখানকার বাসিন্দাদের জীবন।
এলাকার সবাই জানে, এখানে থাকেন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। সামাজিক পরিচয় ও পেশার কারণে যাদের দীর্ঘদিন সমাজের প্রান্তে ঠেলে রাখা হয়েছে। তাই খুব বেশি মানুষের আনাগোনা নেই এখানে।
কলোনির ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, ভবনের বাসিন্দারা ছোট্ট উঠোনটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন। কিন্তু সেখানে কোনো আড্ডার আমেজ নেই। হাসি নেই কারো মুখেই। সবার মুখেই যেন চিন্তার ছাপ। সামনে কী হবে, কোথায় যাবেন তারা, কোথায় ঠাঁই হবে- এসব অনিশ্চয়তাই এখন তাদের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী।
সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক নোটিশে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে মিনিয়াডস কোয়ার্টার বা 'সুইপার কলোনি'র সব বাসিন্দাকে তাদের আবাসন খালি করতে হবে। এই নির্দেশের পর থেকেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে কলোনির বাসিন্দাদের।
ওই ভবনের অন্যতম বাসিন্দা রিংকু শার্মা জানান, বর্তমানে এই কলোনির দোতলা ভবনটিতে ৬০টি কক্ষ রয়েছে। সেখানে প্রায় ২০০ মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে অর্ধেকই হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। হঠাৎ চলে যেতে হলে মাথা গুঁজবেন কোথায়?
তিনি আরও জানান, বর্তমানে কলোনির ৩১ জন বাসিন্দা হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। তাদের মধ্যে হরিজন রয়েছেন ৭জন। এছাড়া এই সম্প্রদায়ের ৮জন রয়েছেন যারা হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী।
ভবনটির অন্য বাসিন্দাদের তুলনায় হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের সংকট আরও প্রকট বলে মনে করেন রিংকু। তার ভাষ্য- সামাজিক পরিচয়ের কারণে এখনও নানা ধরনের বৈষম্য ও অবহেলার মুখে পড়তে হয় তাদের। সমাজের একটি অংশের চোখে তারা এখনও 'অচ্ছুত'। নিজেদের বিকল্প কোনো আবাসন ব্যবস্থাও গড়তে পারেনি তারা। তাই শতাব্দীপ্রাচীন এই বাসভূমি থেকে উচ্ছেদের আগে যথাযথ পুনর্বাসনের দাবি তাদের।
'কোথায় যাব?'
মালারানি শার্মার বয়স প্রায় ৬৫ বছর। তার আগের চার-পাঁচ প্রজন্ম এই বাড়িতেই জীবনের শেষ দেখেছেন। মালারানি নিজেও একসময় মিটফোর্ড হাসপাতালে চাকরি করতেন। এখন তিনি অবসর নিয়েছেন। তার বাবা-কাকারাও এই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার কাজই পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। যেমনটি আগে করেছিলেন তাদের পূর্বপুরুষেরা।
মালারানি শুধু এটুকুই জানেন, ব্রিটিশ আমলে ভারত থেকে সব সম্পর্ক ঘুচিয়ে তার পূর্বপুরুষেরা একদিন এই কাজের সূত্রে ঢাকায় এসেছিলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া এই কোয়ার্টারই তখন থেকে তাদের আশ্রয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানেই জন্ম, বেড়ে ওঠা আর জীবনের শেষ দেখেছেন তারা।
"আমার বয়স হয়ে গেছে ৬৫। আমার ভাইয়ের বয়স হয়ে গেল ৭০ বছর। আমরা এখানে জন্মেছি।। এখন আমাদের বলতেছে, এই নাও উচ্ছেদের নোটিশ। উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হলো, এখন আমরা কী করব, রাস্তায় গিয়ে উঠব? এই ঘরগুলোই তো আমার জন্মভূমি। ১৬৮ বছর যাবত আছি, হঠাৎ আমাদের রাস্তায় নামিয়ে দেবে?'', বললেন মালারানি। কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে উঠল।
তিনি জানান, গত মাসে বাসা খালি করার নোটিশ পাওয়ার পর থেকেই তাদের দিন কাটছে আতঙ্কে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোথায় যাবেন, তার কোনো উত্তর তাদের জানা নেই।
মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সই করা ওই নোটিশে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে মিনিয়াডস কোয়ার্টার বা 'সুইপার কলোনি' খালি করতে হবে। একই দিন কলোনির পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলেও নোটিশে জানানো হয়েছে।
'বাসা ভাড়া দেবে কে?'
জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে, উৎসব-শোক, সব মিলিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই এক টুকরো জমিকেই নিজেদের একমাত্র ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছিলেন এই হরিজন পরিবারগুলো। কারণ, সমাজের মূলধারায় তাদের স্থান সামান্যই। সেই একান্ত ঠিকানা হারালে বাসা ভাড়া দেবে কে? মিটফোর্ডের হরিজনেরা সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন।
কলোনির বাসিন্দা বাবু লাল বলেন, তাদের বিকল্প বাসা খুঁজে পাওয়াটা অনেক কঠিন। সম্প্রদায়ের পরিচয়ের কারণে ভাড়া বাসা নিতে গিয়েও নানা ধরনের বৈষম্যের মুখে পড়তে হয় তাদের।
"আমাদের সম্প্রদায়ের কেউ বাসা খুঁজতে গেলেও সমস্যা হয়। ধরেন, কোনো বাসা পছন্দ হলো। কিন্তু যখনই শোনে আমরা কলোনির মানুষ, তখনই নানা অজুহাতে না করে দেয়। বলে, ঘর ভাড়া হবে না এখন, কিংবা হয়ে গেছে। যদি শোনে আমরা হরিজন, আমাদের বাদ দিয়ে দেয়," বলেন বাবু লাল।
হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখনও সামাজিকভাবে নানা ধরনের অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হন। তাদের অভিযোগ, অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় এখনও তাদের বসে খেতে দেওয়া হয় না। সামাজিক পরিচয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। তাই ঢাকার মতো শহরেও কলোনির এই জোটবদ্ধ জীবন ছেড়ে আলাদাভাবে বসবাস করা তাদের জন্য বেশ কঠিন। নতুন করে বাসা খুঁজতে গেলেও পরিচয়ের কারণে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।
ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চিত
এই আবাসন চিন্তার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। কলোনির হরিজন-মুসলমান মিলিয়ে ৪১টি শিশু-কিশোর আশপাশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের স্কুল আর দৈনন্দিন শিক্ষাজীবন গড়ে উঠেছে এই এলাকাকে ঘিরে। হঠাৎ করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে তাদের পড়াশোনা, জানান রিংকু শার্মা।
আম্বিকা ছোট কাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে। কিন্তু কলোনি উচ্ছেদের খবর তার ছোট্ট মনেও দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। সে বলে, "কলোনি আমার ভালো লাগে, কারণ, সবাই মিলে একসঙ্গে থাকতে পারি। খবরটা শুনে আমার খারাপ লাগছে। পড়াশোনায় মন দিতে পারছি না।"
আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে রাজবীর বাল্মীকি (১৬)। এখন কলেজে ভর্তির সময়। আশপাশের কবি নজরুল সরকারি কলেজ বা সোহরাওয়ার্দী কলেজে পড়ার কথা ভাবছে সে। কিন্তু কলোনি ছাড়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন দুশ্চিন্তায় রাজবীর।
সে বলে, "এখন কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। কিন্তু এই অবস্থায় কী করব, কোথায় থাকব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, আমাদের পুনর্বাসনের একটা ব্যবস্থা করা হোক। আমরা যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।"
পুনর্বাসন হবে কি?
কলোনির বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের দাবি নিয়ে ভিন্ন অবস্থানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মনে করেন, পূর্বপুরুষের চাকরির সূত্র ধরে বর্তমান প্রজন্মের সদস্যদের সরকারি কোয়ার্টারে বসবাসের অধিকার থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, "তাদের ৩০-৪০ বছর, ৫০ বছর আগে যারা চাকরি করে গেছে, ১০ বছর আগে যারা রিটায়ারমেন্টে হয়ে গেছে, তাদের ছেলেপেলে, তাদের নাতিপুতি এরা এখন আবার নিজেরা থাকতেছে। একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিতর তো এটা হতে পারে না। চাকরি যতক্ষণ করবে, ততক্ষণ সে কোয়ার্টারে থাকবে, সেটা একটা বিষয় আছে। তাহলে যারা চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টে চলে গেছে, ২০ বছর আগে, ১৫ বছর আগে, সেসব পরিবার তারা এখানে বংশপরম্পরায় থেকে যাবে, এটা কোন ধরনের দাবি?"
হরিজন সম্প্রদায়ের নেতারা পুনর্বাসনের দাবিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছেন এবং বিভিন্ন স্মারকলিপিও দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জায়গার সংকট থাকায় তাদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান উপপরিচালক।
তার ভাষ্য, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পোস্ট অফিসের একটি উপশাখার জন্যও জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, "পুনর্বাসনের কোনো জায়গা নাই। আমার এখানে পোস্ট অফিস, সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ অফিস। সেই পোস্ট অফিসকেই আমি জায়গা দিতে পারছি না। আমার রোগী রাখার জায়গা নাই।"
৩০ আগস্টের মধ্যে বাসিন্দারা আবাসন না ছাড়লে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে চাননি ডা. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, নোটিশে যা বলা হয়েছে, সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পুরোনো ভবনটি অপসারণ করে সেখানে নতুন হাসপাতাল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ও হাসপাতালের সেবার সুযোগ বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে উপপরিচালক বলেন, "সরকার টেন্ডার করে ফেলছে। এটা অপসারণের জন্য টেন্ডার হয়ে গেছে। এখানে নতুন হাসপাতাল ভবন হবে। ওদের থাকতে দেওয়া বেশি জরুরি, না কি আমার একটা মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা পাওয়া জরুরি—আপনার কী মনে হয় সাধারণ জ্ঞানে?"
তবে এই উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে চলমান দাবি ও প্রতিবাদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, "এগুলো বিভিন্ন প্ররোচনায় ইস্যু তৈরি করতেছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন রকম এরকম ইস্যু তৈরি করে না মানুষজন? এগুলো সরকারকে বিব্রত করার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট ইস্যু তৈরি করে সেগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে বড় করার পাঁয়তারা ছাড়া কিছু নাই। এগুলাতে আজেবাজে লোকের ইন্ধন আছে।"
কী হবে ওদের
আগে বংশপরম্পরায় পরিচ্ছন্নতার চাকরি পেতেন কলোনির হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই প্রথাও বন্ধ হয়ে গেছে।
মঞ্জু রানী দাশ মিটফোর্ড হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে ২৬ বছর কাজ করেছেন। অবসরের পর পরিবারের আর কাউকে তার জায়গায় চাকরি দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখন উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়ার পর তার প্রশ্ন, কাজের সুযোগ হারানোর পর এবার কি হারাতে হবে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও?
তিনি বলেন, "বাপের চাকরি আর ছেলেদের দেয় না। আগে আমাদের ঘৃণা করত, এখন চাকরি নিয়া নিছে। তাইলে আমরা বাঁচমু ক্যামনে?"
পুনর্বাসনের জন্য খুব বেশি কিছু চান না বলে জানান মঞ্জু রানী। তার দাবি, কোথাও পাটখড়ি দিয়ে হলেও একটি ঘর করে দেওয়া হোক তাদের। অন্তত মাথা গোঁজার জায়গাটুকু যেন থাকে। নইলে পরিবার নিয়ে রাস্তায় গিয়ে উঠতে হবে বলে আশঙ্কা তার।
এদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া নোটিশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাসা খালি না করলে পরবর্তীতে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি বা ক্ষয়ক্ষতির দায় অবস্থানকারীদের নিজেদের বহন করতে হবে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে নোটিশে।
তবে কি ছেড়ে দিতে হবে এই বাসস্থান? যাদের পূর্বপুরুষদের একদিন সরকারের প্রয়োজনে পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য নিজেদের জন্মভূমি থেকে এনে এখানে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তাদের উত্তরসূরিদের কি আবারও জন্মভূমি হারাতে হবে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নারী, শিশু কিংবা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই সাংবিধানিক সুযোগ ব্যবহার করে রাষ্ট্র কি এই অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন ও বিকল্প ব্যবস্থার পথ তৈরি করবে? নাকি কোনো কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত না করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা এই ঠিকানা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হবে?
উত্তরটা আপাতত সময়ের হাতেই।
এই দুঃখের শেষ কোথায়
বাংলাদেশের শহরগুলো প্রতিদিন পরিষ্কার রাখার পেছনে যে সম্প্রদায়ের অবদান আজও সবচেয়ে বেশি, তাদের জীবনটা কিন্তু খুব সুখের নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত থেকেও হরিজন সম্প্রদায়ের বহু মানুষ এখনও সামাজিক বৈষম্য, আবাসন সংকট ও মজুরি বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করছেন।
বাংলাদেশ হরিজন ছাত্র ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং 'হরিজন সারাক্ষণ'-এর প্রতিষ্ঠাতা কিরন চন্দ্র বাঁসফোর এর মতে, বর্তমানে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ তিনটি বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে।
তিনি জানান, জাতিগত ও সামাজিক বৈষম্য, আবাসনের অনিশ্চয়তা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য হরিজনদের জীবন অনেক কঠিন করে রেখেছে।
সমাজের একটি অংশ এখনও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষকে নিচু স্তরের মানুষ হিসেবে দেখে। এর প্রভাব পড়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনেও। অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষের মতো হোটেলে বসে খাওয়া কিংবা সেলুনে গিয়ে চুল কাটার ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের মুখোমুখি হন। মূলধারার সমাজের অনেক মানুষ এখনও এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে সংকোচ বোধ করেন।
তবে কিরন চন্দ্র বাঁসফোরের মতে, সবচেয়ে তীব্র সংকটগুলোর একটি আবাসন। বাংলাদেশের অধিকাংশ হরিজন জনগোষ্ঠী খাসজমিতে গড়ে ওঠা কলোনিতে বসবাস করে।
তিনি বলেন, "যেখানেই হরিজনদের কলোনি আছে, সেখানেই দেখা যাবে তাদের বসবাসের ইতিহাস অন্তত ৫০ থেকে ৬০ বছরের। অনেক কলোনি ১০০, ১৫০ কিংবা ২০০ বছরের পুরোনো। এমনও জায়গা আছে, যেখানে কয়েক শ বছর ধরে এই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসছে।"
কিন্তু কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে হঠাৎ উচ্ছেদের নোটিশ এলে সেই নিরাপত্তাবোধ মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। কারণ, অধিকাংশ পরিবারের বিকল্প কোনো আবাসন বা অর্থনৈতিক সঞ্চয় নেই। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর স্বল্প আয়ে পরিবার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে জমি কিনে নতুন বাড়ি করা তাদের কাছে প্রায় অসম্ভব।
কিরন চন্দ্র বাঁসফোর বলেন, "সরকারের প্রয়োজনেই একসময় তাদের এনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশে রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রয়োজন হলে হঠাৎ করে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়। তাদের আর্থিক কোনো ব্যাকআপ নেই। সামান্য যে আয়, তা দিয়ে পরিবার চালানোই কঠিন। জমি কিনে বাড়ি করা তাদের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো।"
কিরন চন্দ্র বাঁসফোরের মতে, পরিচ্ছন্নতার কাজের বাইরে অন্য কোনো পেশায় গেলে এখনও অনেককে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার সংকটে পড়তে হয় তাদের। কেউ দোকান দিলে সেখানে মানুষ খেতে চাইবে না, রিকশা চালালে যাত্রী উঠতে সংকোচ করবে, এমন অভিজ্ঞতা ও আশঙ্কা বহু মানুষকে একই পেশার গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখে।
তিনি বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতে অনেকের মাথায় এমন ধারণা ঢুকে গেছে যে, আমরা হয়তো সত্যিই নিচু জাতি। সমাজ যেভাবে আমাদের উপস্থাপন করেছে, একসময় আমরা নিজেরাই সেভাবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছি।"
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। আবাসনের স্থায়ী সমাধান, ন্যায্য মজুরি এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি নিশ্চিন্ত হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারবে।