'ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত': মুসলিম নেতার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ভারতে
উত্তর ভারতের একটি ছোট শহরে জুলাইয়ের তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে মাদুরে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন শতাধিক মানুষ। তারা স্লোগান দিতে দিতে হাতে ধরা জাতীয় পতাকা নাড়ছেন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে—যেখানে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত হাজার হাজার বিক্ষুদ্ধ তরুণ সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন—সেখানেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ধ্বংস করার পরিকল্পনার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘট পালন করছেন একদল সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিষ্ঠানটির নাম মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক প্রখ্যাত বিপ্লবীর নামে নামঙ্কিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরপ্রদেশের রামপুর জেলায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রখ্যাত মুসলিম রাজনীতিবিদ আজম খান। ২০০৩ সালে আজম খান 'মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট' গঠন করেন, যার অধীনে তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
গত ১৫ জুলাই, এক প্রতিবাদী ব্যঙ্গ থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠন 'ককরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই রামপুর জেলা প্রশাসন বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তাবিত একটি মেডিকেল কলেজ ব্লকসহ মাত্র দুটি ভবন বৈধ অনুমোদন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তাই ৫ আগস্টের মধ্যে বাকি সব 'অবৈধ' ভবন ভেঙে ফেলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় বুলডোজার দিয়ে ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং ভাঙার খরচও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার রাজ্য প্রশাসন এই নির্দেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করে, তবে ভাঙার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে কি না তা স্পষ্ট করেনি।
জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরুদ্দিন আল জাজিরাকে জানান, অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, "এর মানে হলো– রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) নির্ধারিত ৫ আগস্টের শেষ সময়সীমার মধ্যে ভাঙার কাজটি হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে, যা এই উচ্ছেদ আদেশকে পুরোপুরি বাতিল করবে।"
'উচ্ছেদ বন্ধ করো'
২৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে পড়ালেখা করেন প্রায় ৩,০০০ শিক্ষার্থী, তাদের জন্য প্রাদেশিক সরকারের এই সিদ্ধান্ত যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। ১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল ফটকের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করছেন একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তাদের একদফা দাবি—উচ্ছেদ আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
২০১৯ সালে জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা ওসামা তায়েব প্রশ্ন তোলেন, "সিজিপির আন্দোলনের মুখে যদি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, তাহলে এত সংখ্যক শিক্ষার্থী রাস্তায় আন্দোলন করার পরও কেন উত্তরপ্রদেশ সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য করা যাবে না?"
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশে প্রায় ২৪ কোটি মানুষের বাসস্থান। এই রাজ্যে ২০১৭ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ হলেন গেরুয়া পোশাক পরা এক কট্টরপন্থী হিন্দু সন্ন্যাসী, যিনি তার মুসলিমবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য ও তাদের বিরুদ্ধে দমনপীড়নমূলক নীতির জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ৭৭ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন চ্যান্সেলর আজম খান উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কঠোরতম সমালোচকদের একজন। তিনি সমাজবাদী পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই রাজনৈতিক দলটি রাজ্যের প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিম এবং একটি বড় অংশের নিম্নবর্ণের হিন্দু ভোটারদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
সত্তর দশকে আজম খান রামপুর থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে ভারতের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। আলীগড়ে একজন প্রখর ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী রামপুর জেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে। পরবর্তীতে রাজনীতিতে এসে আজম খান রামপুরের সাবেক রাজপরিবারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, যারা কয়েক দশক ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল।
১৯৮০ সালে তিনি নির্বাচনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি উত্তরপ্রদেশের বিধানসভায় রামপুরের প্রতিনিধি হিসেবে ১০ বার নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড করেন। বিভিন্ন মেয়াদে তিনি রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রামপুর থেকে ভারতের লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজ দলের মনোনয়নে উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্যও হন তিনি। ২০০৩ সালে তিনি 'মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট' প্রতিষ্ঠা করেন, যার হাত ধরে তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে ওঠে। এই প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমেই উত্তর ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম নেতা হিসেবে তার অবস্থান স্থায়ী রূপ নেয়।
আর এটিই তাকে বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
'প্রতিহিংসার রাজনীতি'
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই যোগী আদিত্যনাথের সরকার আজম খানের বিরুদ্ধে জমি দখল, জালিয়াতি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগে প্রায় ১০০টি মামলা করে। এর মধ্যে কয়েক ডজন মামলা সরাসরি জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট জামিন দেওয়ার আগে আজম খানকে দুই বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হয়। পরের বছর রামপুরের একটি আদালত ভুয়া জন্মসনদ ব্যবহারের অভিযোগে তাকে, তার স্ত্রী তাজিন ফাতিমা এবং তাদের ছেলে ও সাবেক বিধায়ক আবদুল্লাহ আজম খানকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন।
২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় "উস্কানিমূলক বক্তব্য" দেওয়ার অভিযোগে চলতি বছরের মে মাসে দেওয়া দুই বছরের কারাদণ্ড বর্তমানে ভোগ করছেন তিনি। এর পাশাপাশি জাল আয়কর সংক্রান্ত অন্য একটি মামলাতেও তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত।
আজম খানের সমর্থকদের দাবি, তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে রাজ্য সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আজম খানের সঙ্গে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক না থাকা সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য জাবেদ আলী খান আল জাজিরাকে বলেন, জওহর বিশ্ববিদ্যালয় উচ্ছেদের এই নির্দেশ হলো "শিক্ষা-বিরোধী ও সাধারণ মানুষকে অশিক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর এক চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।"
তিনি বলেন, "এই বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আজম খান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, সমাজবাদী পার্টির জনক মুলায়েম সিং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তৃতীয়ত, এটি উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। আর চতুর্থত, এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়।"
সমাজবাদী পার্টির মূল প্রতিষ্ঠাতা মুলায়েম সিং যাদব ২০২২ সালে মারা যান। বর্তমানে তার ছেলে অখিলেশ দলটি পরিচালনা করছেন। তিনি ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসসহ বিজেপিবিরোধী জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা।
অবশ্য বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী দাবি করেছেন, উচ্ছেদের এই নির্দেশ "অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি প্রক্রিয়ার অংশ"। পাশাপাশি তিনি সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে "তোষণ রাজনীতি" করার অভিযোগ তোলেন।
আল জাজিরাকে ত্রিপাঠী বলেন, "কেউ কি অস্বীকার করতে পারবে যে আজম খান অবৈধ জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তৈরি করেছিলেন? সমাজবাদী পার্টি সরকারের আমলে– তিনি নিজের পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে অবৈধ জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও ভবন নির্মাণ করেছেন। আমরা কেবল অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন মেনে চলছি, আর তার অর্থ হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলা উচিত।"
'মেয়েরা আর কখনো শিক্ষার সুযোগ পাবে না'
তবে রামপুরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে সাক্ষরতার হারে রামপুর কেবল ৪টি জেলার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির চিফ প্রক্টর গুলরেজ নিজামীর মতে, জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই ছাত্রী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী ইকরা আল জাজিরাকে বলেন, নির্দিষ্ট কিছু সুবিধার কথা ভেবেই তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, "অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখানকার পরিবেশ এবং নারী শিক্ষার্থীদের যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাতে আমাদের অভিভাবকেরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন।"
ইকরা বলেন, "যদি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলা হয়, তবে আমাদের মতো মেয়েরা অন্য কোথাও পড়ার দ্বিতীয়বার সুযোগ আর কখনোই পাবে না। আমাদের অভিভাবকেরা আমাদের অন্য কোথাও পাঠাতে রাজি হবেন না। তারা এই জায়গাটি বেছে নিয়েছিলেন কারণ তারা বিশ্বাস করতেন যে এখানে মুসলিম মেয়েরা নিরাপদ।"
ইকরা জানান, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে শিক্ষার্থীরা যেন অন্য কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন– সেজন্য রাজ্য সরকার একটি কাউন্সিলিং ক্যাম্প পরিচালনা করছে। "কিন্তু আমরা সেখানে যেতে চাই না। আমরা একটি বিশেষ কারণে এই প্রতিষ্ঠানটি বেছে নিয়েছিলাম," বলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কেবল মুসলিমরাই প্রতিবাদ করছেন না—প্রতিষ্ঠানটির এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের।
প্যারামেডিক্যাল বিষয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রী চাঁদনী দিবাকর আল জাজিরাকে বলেন, "তারা হয়তো এটাকে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় বলে ডাকতে পারে এবং হ্যাঁ, আইনি পদমর্যাদায় এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়; কিন্তু তার মানে এই নয় যে এখানে অন্য কেউ পড়ে না।"
অবস্থান ধর্মঘটের স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, "আমি গত এক বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অ-মুসলিম হিসেবে কখনোই আলাদা বা ভিন্ন কিছু অনুভব করিনি। শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী—এখানে সবাই অত্যন্ত বন্ধুত্বসুলভ।"
আরডিএ জানিয়েছে, আঞ্চলিক এক কর্মকর্তার রিপোর্টের ভিত্তিতেই তারা এই ব্যবস্থা নিয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে আইন লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়। গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরডিএ—উভয় পক্ষের আইনজীবীদের নিয়ে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
১৫ জুলাই সাংবাদিকদের রামপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিএ-র ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী বলেন, "তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তারা লিখিত জবাবও দিয়েছে। জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত ৪০টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবনই নিয়মবহির্ভূত প্রমাণিত হয়েছে।"
কিন্তু উপাচার্য জহিরুদ্দিন এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দাবি করেন, ভবনগুলো নির্মাণের বহু বছর পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রামপুরের সিঙ্গানখেড়া গ্রামে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি আরডিএ-র এখতিয়ারভুক্ত এলাকার আওতায় আসে। তাই নির্মাণের সময় কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না এবং এখন তা দাবি করাও যৌক্তিক নয়।
আরডিএ-র এই পদক্ষেপকে শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সিঙ্গানখেড়ায় আরডিএ-র কোনো এখতিয়ার ছিল না। আমরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদিত কোর্সগুলো পরিচালনা করছি, যা আমাদের সমস্ত শর্ত পূরণের পরেই দেওয়া হয়েছিল।"
তিনি বলেন, "সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নতির জন্য যে দূরদর্শী আজম খান এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন, তার বিরুদ্ধেই এটিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।"
তবে কর্মকর্তাদের দাবি, বিদ্যমান আইনের অধীনে কথিত এই বিধির লঙ্ঘনকে বৈধ করার কোনো সুযোগ নেই, ফলে ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়াই একমাত্র আইনি সমাধান।
আল জাজিরা এবিষয়ে মন্তব্যের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিবেদীর সাথে বার বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, এমনকি রামপুরে তার কার্যালয়েও গিয়েছিল। কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ করতে বা সাক্ষাৎকারের অনুরোধের জবাব দিতে অস্বীকার করেন।
'পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসছে'
ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরডিএ-র আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন বিভাগের স্নাতক উসমান আলী আল জাজিরাকে বলেন, "অন্যরা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে সাফল্য পেতে পারে, তাহলে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্ছেদ বন্ধের মতো ন্যায্য দাবি কেন আদায় করতে পারব না? এর জন্য যদি ত্যাগের প্রয়োজন হয়, তবে আমরা তা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমরা আর এই অবিচার মেনে নেব না।"
তিনি অভিযোগ করেন যে, আন্দোলন প্রত্যাহার করতে পরিবারগুলোকে চাপ দিতে পুলিশ ধর্মঘটকারী শিক্ষার্থীদের বাড়িতে যাচ্ছে। "পুলিশ আমাদের বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের পরিণতির হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাব না।"
গত শনিবার আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে সমাজবাদী পার্টির সাংসদদের একটি প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে ছিলেন জাবেদ আলী খান, সাম্বালের জিয়াউর রহমান বার্ক এবং কৈরানার ইকরা চৌধুরী।
২০১৪ সালে বিজেপির নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, মসজিদ, দোকানপাট ও অন্যান্য সম্পত্তি উচ্ছেদের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বলছে, এই উচ্ছেদ অভিযানের প্রধান শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা কেবল "অবৈধ দখলদারদের" লক্ষ্যবস্তু করছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি সাহিত্যের শিক্ষক অপূর্বানন্দ আল জাজিরাকে বলেন, "এই উচ্ছেদের একাধিক মাত্রা রয়েছে। প্রথমত, হিন্দু ভোটারদের সামনে প্রভাবশালী মুসলিমদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে একটি নাটকীয় দৃশ্য তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের পুরো মেয়াদে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো হয়েছে। এবং তৃতীয়ত, তারা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতি বা মেলবন্ধন চায় না, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে।"
রামপুরে ফিরে জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন সাবেক শিক্ষার্থী আবদুল কলিম আনসারী তাদের আন্দোলনের সাথে সিজেপির আন্দোলনের তুলনা করেন। সিজেপি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
উভয় আন্দোলনেই অংশ নেওয়া আনসারী জানান, যে শিক্ষা সংস্কারের দাবি 'ককরোচ' আন্দোলনকারীদের রাজপথে নামিয়েছিল, তাদের এজেন্ডায় দিল্লি থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সংখ্যালঘু পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় উচ্ছেদের বিষয়টি না থাকায় তিনি বিস্মিত।
তিনি বলেন, "এটা সত্যিই তাজ্জব বিষয় যে তারা শিক্ষা সংস্কারের কথা বলছে, অথচ দিল্লি থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জওহর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া উচ্ছেদের নোটিশ নিয়ে টু-শব্দটিও করছে না। এখানকার সব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে, এবং আমরা জানি না এখান থেকে আমাদের কোথায় যেতে হবে।"
