ভবিষ্যতেও হিমালয়ে হিমবাহ গলে বন্যার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে, বাসস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ: জাতিসংঘ
গত সপ্তাহে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট নেপালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যেই জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে হিমালয় অঞ্চল ভয়াবহ হিমবাহ ধসে বা গলে পরার কারণে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বহু মানুষ নির্ভরশীল এমন জলবিদ্যুৎ উৎপাদনই শুধু হুমকির মুখে পড়বে না, লাখ লাখ মানুষ বসবাসকারী নদীতীরের বিস্তীর্ণ এলাকাও কার্যত বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব কান্নি উইগনারাজা এক সাক্ষাৎকারে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, 'হিমবাহের হ্রদগুলোর অতিরিক্ত পানি যে বিশাল নদী ব্যবস্থাগুলো দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, সেসব এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে প্রযুক্তি যথেষ্ট দ্রুত এগোতে পারছে না।'
২০২০ সালে গবেষকেরা নেপাল, চীন ও ভারতে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ৪৭টি হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করেছিলেন। এরপর প্রকৃত সংখ্যায়ও এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে ধারণা করা হয়েছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা উইগনারাজা বলেন, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা 'কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে'। তিনি জুন মাসে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ও সহযোগী সংস্থাগুলোর সংকলন করা হালনাগাদ তথ্যের কথা উল্লেখ করেন।
নেপালে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত ঘটে লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের কিছু অংশ ধসে উপত্যকার তলদেশে পড়ে যাওয়ার পর। এর ফলে একটি ভূমিধস সৃষ্টি হয় এবং সেই ভূমিধস ত্রিশূলী নদী দিয়ে নিচের দিকে বন্যার প্রবল ঢেউ আকারে ছড়িয়ে পরে।
হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা বন্যা কিছুটা ভিন্ন ধরনের ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা ঘটে যখন গলে যাওয়া হিমবাহের পানি কোনো প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকের পেছনে জমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পানির চাপ বেড়ে সেই প্রতিবন্ধক ভেঙে যায় বা পানি উপচে পড়ে। এর ফলে নদীর নিম্নপ্রবাহে আকস্মিক বন্যা নেমে আসে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে হিমবাহ গলার গতি বাড়ায় উভয় ধরনের ঝুঁকিই বাড়ছে। এর ফলে পাহাড়ের শিলাগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে এবং হিমবাহ-হ্রদের পানি আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে।
উইগনারাজা বলেন, এ অঞ্চলের পাহাড়গুলোও তুলনামূলকভাবে নবীন। ফলে ভূ-অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের কারণে এগুলোতে নড়াচড়া বা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রবণতা বেশি, যা হিমবাহ অথবা হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ হঠাৎ ধসে পড়ার কারণ হতে পারে।
হিমবাহের ওপর নেপালের ব্যাপক নির্ভরতা
গবেষকেরা হিন্দুকুশ পর্বতমালা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদের সন্ধান পেয়েছেন।
তবে উইগনারাজা বলেন, পানি সরবরাহ ও মানুষের আয়ের উৎস—উভয় ক্ষেত্রেই এ অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় নেপাল হিমবাহের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে দেশটি এখন 'খুব, খুব কঠিন কিছু সিদ্ধান্তের' মুখোমুখি হয়েছে।
নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী অনেক মানুষের জন্য উঁচু এলাকায় চলে যাওয়া আর্থিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোও ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
কিছু মূল্যায়নে যে চিত্র উঠে এসেছে, তার চেয়েও নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ক্ষতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বন্যায় চালু থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি নির্মাণাধীন ১৫টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা অচল হয়ে পড়েছে।
উইগনারাজা বলেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বন্যার বিরুদ্ধে আরও বেশি সহনশীল করে তোলা সম্ভব।
তবে গত সপ্তাহে নেপালে নেমে আসা 'কাদা ও বরফের জলোচ্ছ্বাস' এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তখন বিদ্যমান অধিকাংশ প্রতিরোধব্যবস্থাই তা সামলাতে পারতে পারেনি।
তিনি বলেন, 'এমন কোনো নির্মাণ বা অবকাঠামো নেই যা এটিকে আটকাতে পারত।'
