বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা, নেপালে নিখোঁজ চার হাজারের বেশি
হিমবাহ ধসে আকস্মিক বন্যার বিপর্যয় দিনকে দিন বাড়ছেই নেপালে। উদ্ধার অভিযানের ষষ্ঠ দিনে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৪,২৪৭ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা। এই দুর্যোগে এপর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৯০৩ জনে।
এছাড়া দেশব্যাপী ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিকও নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের সময় তাঁরা সেখানে আটকে পড়েন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের সন্ধান পেতে ইতোমধ্যেই উদ্ধার তৎপরতা জোরালো করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে তারা পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন প্রিয়া খারেল নামের এক নারী, যিনি তাঁর নিখোঁজ ভাইয়ের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না। তবে তিনি আশা করছেন, তাঁর ভাই হয়তো সুড়ঙ্গগুলোর কোনো একটিতে এখনও জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন।
এদিকে নেপালের উত্তরাঞ্চলে আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং জারি করা হয়েছে দুর্যোগ সতর্কতা। ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নেপাল লাগোয়া সীমান্তের তিব্বত অংশেও চীনের জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে অনলাইনে "অপতথ্য বা গুজব ছড়ানোর" অভিযোগে ১০ জনকে শাস্তি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে তিব্বতে ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও ও ফুটেজ সেন্সর করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। দেশটির দাবি, তারা "উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগীভাবে" সব তথ্য প্রকাশ করছে।
নেপাল সরকারও অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বন্যা সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কিছু কনটেন্ট বা ভিডিও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সেনাঘাঁটিগুলোকে অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যেখানে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সার্বিক সহায়তা দিচ্ছেন।
বিপর্যয়ের প্রায় এক সপ্তাহ পরও যে মাত্রায় ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান চালাতে হচ্ছে, তা নেপালে সৃষ্ট সংকটের ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে বলে জানান বিবিসি নেপালি সার্ভিসের প্রতিবেদকরা।
বর্ষা মৌসুমে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে সতর্কতা জারি
গত ২৪ ঘণ্টায় নেপালের কাঠমান্ডুর উত্তর-পূর্বে এবং বন্যা কবলিত অঞ্চলের অদূরে অবস্থিত মেলামচি-ঘায়াং গ্রামে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা প্রায় ৮৯ মিলিমিটার।
আগামী কয়েক দিনের জন্য দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উচ্চমাত্রার বৃষ্টিপাতের সতর্কতা জারি রয়েছে। আবহাওয়া সম্পর্কিত কম্পিউটার মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার শেষ হওয়ার আগেই এই এলাকায় আরও ৬০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। পাহাড়ি ভৌগোলিক গঠনের কারণে একেক এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণে ব্যাপক তারতম্য হতে পারে।
বছরের এই সময়ে ভারত থেকে হিমালয়ের দিকে প্রবাহিত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবেই এই ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সাধারণত পুরো সেপ্টেম্বর মাস জুড়েই এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে এবং অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে মৌসুমি বায়ু বিদায় নেয়।
নতুন বন্যার আগাম সতর্কতায় সিসিটিভি ও সিসমোমিটার বসাচ্ছে নেপাল
নতুন করে বন্যা দেখা দিলে তা পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা জারির লক্ষ্যে নেপালের রসুয়া জেলায় সিসিটিভি ক্যামেরা এবং সিসমোমিটার বসানোর কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিভাগের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা জানান, গত বুধবারের বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ৬টি বন্যা শনাক্তকারী সেন্সর ভেসে গেছে। এই সেন্সরগুলোর সাহায্যে সেখানকার নদীগুলোর পানির প্রবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যেত এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে স্থানীয়দের বন্যার সতর্কতা সংকেত পাঠানো হতো।
পুরোনো যন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং নতুন সেন্সর বসাতে সময় লাগার কারণে, সময়মতো বন্যার তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে জানান তাঁরা।
তাঁরা আরও জানান, নতুন করে বসানো দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার সাহায্যে উজানের পাহাড় থেকে কোনো ঢল নেমে আসছে কি না, তা সরাসরি বা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া যে সিসমোমিটারটি স্থাপন করা হচ্ছে, তা গত ২৬ আগস্টের মতো বড় ধরনের ভূমিধস বা বরফ-পাথরের ধস শনাক্ত করতে সাহায্য করবে; কারণ এ ধরনের ভয়াবহ ধসের সময় ভূকম্পন তৈরি হয়।
অন্যদিকে চীনা সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যে হিমবাহ ধসের কারণে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই স্থানে ও তার আশপাশে নতুন করে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
