‘পানি আসছে, দৌড়াও’: যেভাবে এক ব্যক্তির চিৎকারে বেঁচে গেল নেপালের স্কুলে থাকা ৩৭০ জন
'ভয়াবহ বন্যার পানি আসছে, সবাই দৌড়াও...'—এক ব্যক্তির এই চিৎকার রক্ষা করেছে ৩৭০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে। হিমালয়ের কোলঘেঁষে অবস্থিত নেপালের বেত্রাবতীর উত্তরগয়া পাবলিক ইংলিশ সেকেন্ডারি স্কুলে এ ঘটনা ঘটে। ত্রিশূলী বাজার থেকে স্কুলটির দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল আঘাত হানার ঠিক কয়েক মিনিট আগে এই চিৎকারই তাদের একমাত্র সতর্কবার্তা হয়ে এসেছিল।
গত বুধবার সকালে যখন আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে, তখন স্কুলে অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছিল। হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা কেবলই সকালের নাস্তা করেছে।
এমন সময় কোনো সরকারি সতর্কসংকেত কিংবা জরুরি র্তার আগেই ভেসে আসে সেই পথচারীর হাঁক ডাক। শিক্ষকরা আর দেরি না করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্যাম্পাসের পেছনের গভীর পাহাড়ি বনের দিকে ছুটতে শুরু করেন। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধেয়ে আসা কাদামাটি ও পানির তীব্র স্রোতে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে মূল সড়ক ও সাধারণ রাস্তাগুলো নিমেষে তলিয়ে দেয়।
পরিস্থিতির আকস্মিকতা বর্ণনা করতে গিয়ে স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক সোমলাল ডাঙ্গোল জানান, 'কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি এত বড় বন্যা আসতে পারে। তাই শুরুতে শিক্ষার্থীরা খুব বেশি দূরে দৌড়ায়নি। তবে তারা যখন চোখের সামনে পানির ভয়াবহতা দেখে, ততক্ষণে মূল রাস্তা দিয়ে পালানোর আর কোনো উপায় ছিল না।'
সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে জানায়, সপ্তম থেকে দশম শ্রেণীর বড় শিক্ষার্থীরা নিজেরা প্রাণপণে পাহাড়ে উঠলেও, শিশু শ্রেণীর ছোটদের কাঁধে তুলে কাদার মধ্য দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন শিক্ষকরা। সেদিন পুরো রাত তারা পাহাড়ের বনে কাটিয়েছিল। শিক্ষকরা তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করে।
দশম শ্রেণীর ছাত্র সুজল লামা জানায়, সকালের টিউশন শেষে নাস্তা খেতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে অপরিচিত ব্যক্তির এই সতর্কবার্তা পায়।
সুজল লামা বলেন, 'প্রথমে বেভেছিলাম, নদীর পানি খুব বেশি বাড়বে না। আমি যদি খেতে যেতাম, তবে বন্যা আমাকে সাথে সাথেই ভাসিয়ে নিয়ে যেত।' পরিস্থিতির ভায়বহতা বুঝতে পেরে পরে সুজল লামাও পাহাড়ের বনের দিকে দৌড়ে চলে যায়।
অন্যদিকে, অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী রশ্মি তামাং জানায়, সারা শরীরে কাদা মেখে খাড়া পাহাড়ে ওঠাও অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। সেখানে আবার ছোট শিশুরা দৌড়াতেও পারছিল না।
তবে স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও এই দুর্যোগে এক করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে একটি পরিবারে। বন্যায় নিজের দশম শ্রেণীতে পড়া ছেলে আয়ুষকে বাঁচাতে স্কুলে ছুটে এসেছিলেন নবরাজ তামাং নামে এক অভিভাবক।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বৃদ্ধা মা মুংশি তামাংকে তিনি বলে এসেছিলেন, 'মা, আমি আয়ুষকে নিয়ে আনতে যাচ্ছি।' কিন্তু ছেলেকে বাঁচানোর সেই আকুতি অপূর্ণই থেকে যায়; স্কুলে পৌঁছানোর আগেই পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে যান নবরাজ। তবে তার ছেলে আয়ুষ বনের দিকে পালিয়ে জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
বন্যার পর স্কুলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সব নথিপত্র নষ্ট হয়ে যায়।
স্কুলের সহ-প্রধান শিক্ষক পবন শর্মা বলেন, 'দেশ-বিদেশ থেকে অভিভাবকরা অনবরত ফোন করছেন, কিন্তু আমাদের কাছে কোনো রেকর্ড বই অবশিষ্ট নেই। তবে আমরা ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে সরাসরি তাদের অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করতে পেরেছি এবং বাকিদের পরিবারের সাথেও যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি।'
যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সব শিক্ষার্থীর অবস্থান এখনো শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
