নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃত বেড়ে ৭৫০; শত শত অজ্ঞাত মরদেহকে গণসমাধি দেওয়া হচ্ছে
শনিবার সাময়িকভাবে আবহাওয়াজনিত কারণে বন্ধ থাকার পর নেপালে আবারও অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে। ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বতে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে। তিব্বত সীমান্তবর্তী একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩ হাজার নিখোঁজ মানুষের সন্ধান চালাচ্ছে।
নেপালের দুর্যোগ বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, নেপালে মারা গেছেন ৭৩৪ জন। আর নিখোঁজ হয়েছেন ২ হাজার ৪৯৮ জন। অন্যদিকে চীন ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজের তথ্য জানিয়েছে।
অজ্ঞাত মরদেহগুলোকে গণকবর দেওয়া হচ্ছে
এদিকে বন্যায় প্রাণ হারানো শত শত অজ্ঞাত মরদেহগুলো নেপালের চিতওয়ান জেলার একটি বনে গণকবর দেওয়া হচ্ছে।
বন্যায় বিধ্বস্ত রসুয়া উপত্যকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের সমতল এলাকায় চিতওয়ানের দেবঘাট বনে মরদেহগুলো দাফনের জন্য শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে।
ইতোমধ্যেই কর্তৃপক্ষ শনিবার বনে ৯৬টি অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করেছে। আজ রোববার আরও ১০০টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
কিছুদিন আগেও বনটির পথগুলো ছিল সকালের হাঁটার জনপ্রিয় স্থান। এখন সেগুলোই অস্থায়ী কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত পচনের কারণে যেসব মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলো সেখানে দাফন করা হচ্ছে।
চিতওয়ানের বারতপুরের জেলা প্রশাসক গণেশ আর্য বলেন, "আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। তাই এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। মরদেহগুলো দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল, সেটিই ছিল আমাদের প্রধান উদ্বেগ।"
সহায়তার আহ্বান
প্রায় ৩ কোটি মানুষের দরিদ্র হিমালয়ঘেরা দেশ নেপাল বিশেষজ্ঞ বিদেশি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী রয়টার্সকে বলেছেন, বন্যায় বিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে নেপালের প্রায় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে।
হিমবাহ ধসে সৃষ্ট এই ভয়াবহ দুর্যোগে বুধবার পাহাড়ি নদীগুলোর ওপর দিয়ে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রচণ্ড স্রোত নেমে আসে। এতে নেপালে অন্তত ৬৬৯ জন এবং চীনের তিব্বতে সাতজন নিহত হয়েছেন। ওই স্রোতে ভবন, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে যায়।
প্রায় ৩ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপালের প্রায় দুই হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের গিরং কাউন্টির ৫৫৪ জন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী।
পচে যাওয়া, শনাক্তের অযোগ্য মরদেহ দাফন করা হবে
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রসুয়া জেলায় বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর শনিবার বিকেলে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ আবার শুরু হয়। জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'হেলিকপ্টারগুলো উড়ছে এবং আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় অভিযান আবার শুরু হয়েছে।'
শুক্রবারও কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকাজ স্থগিত করেছিল। কারণ বন্যার পর নেপাল-চীন সীমান্তজুড়ে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল।
শনিবারের মধ্যে পরিস্থিতির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে এবং হ্রদের তলদেশের কিছু অংশ দৃশ্যমান হতে শুরু করে বলে চীনা কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে। উপগ্রহের ছবিতে দেখা গেছে, হ্রদের পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে এবং এর আয়তনও ক্রমে কমছে বলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি জানিয়েছে।
বন্যাকবলিত এলাকার উজানে থাকা দুটি হ্রদের মধ্যে এটি একটি, যেগুলোর ওপর নেপাল নজর রাখছে। একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, দুটি হ্রদের পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকি থাকবে।
দুর্যোগের তিন দিন পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার করা কিছু মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কারণে আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে এসব মরদেহ দাফন করা হবে।
চিতওয়ান জেলা প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, 'ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে এবং মরদেহগুলো খোলা জায়গায় দাফন করা হবে।'
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারগুলো
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা মহারাজগঞ্জ মেডিকেল ক্যাম্পাসের বাইরে জড়ো হয়েছেন। সেখানে কিছু মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অনেকে হাসপাতালের ফটক ও সীমানাপ্রাচীরে টাঙানো মরদেহের ছবির মাধ্যমে স্বজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
মালয়েশিয়ায়ও তিব্বত ও নেপালজুড়ে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত ৯১ নাগরিকের পরিবার স্বজনদের খবরের অপেক্ষায় রয়েছে।
তাদের কয়েকজনের প্রতিনিধিত্বকারী মানিভান্নান রেথিনাম দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি যোগাযোগব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। স্বজনদের খবরের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য তথ্যের এই ঘাটতি 'গভীরভাবে যন্ত্রণাদায়ক' বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের কাজ অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির ২৭৫ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
বেঁচে যাওয়া মানুষদেরও এখন নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তোলার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
৪৩ বছর বয়সী সরস্বতী ঘালে বলেন, বন্যায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। পানি আঘাত হানার সময় তিনি কীভাবে উঁচু জায়গার দিকে দৌড়ে উঠেছিলেন, তা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন মাটি এমনভাবে কাঁপছিল, যেন ভূমিকম্প হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই... আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু সামনে কী হবে, কে জানে।'
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে রয়টার্সকে বলেছেন, সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে।
তিনি বলেন, 'এটি কেবল একটি প্রাথমিক হিসাব। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে।'
কারিগরি সহায়তা
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, সুড়ঙ্গে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার, সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, মরদেহ শনাক্ত করা, ডিএনএ পরীক্ষা করা এবং দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের জন্য নেপালের বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভারতীয় সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞদের একটি দল শনিবার নেপালে পৌঁছেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য বেইজিং পাঁচজন সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে। আরও চারজন বিশেষজ্ঞ পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন।
ভারত ইতোমধ্যে তিনটি বিমানে করে ৬০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এসব ত্রাণের মধ্যে কম্বল, ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী রয়েছে।
ভারত আরও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল, অস্থায়ীভাবে স্থাপনযোগ্য সেতু এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষও বন্যার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ৫০০ জনের বেশি মানুষকে খুঁজে বের করার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিরং সীমান্ত পারাপারকেন্দ্রে শুক্রবার উদ্ধারকারীরা পৌঁছান। সড়ক ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাঁরা দড়ি ব্যবহার করে বন ও খাড়া পাহাড়ি এলাকায় চলাচল করেন।
শনিবার সকালে বৃষ্টির মধ্যেই ৫০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী পাথর ও কাদার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালান। তাঁরা জীবিত থাকার কোনো চিহ্ন খুঁজছিলেন এবং সম্ভাব্য জীবিতদের উদ্দেশে ডাক দিচ্ছিলেন বলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে।
সীমান্ত পারাপারকেন্দ্রের নজরদারি ক্যামেরার ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্যার সময় প্রচণ্ড পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ ভবনগুলোকে গ্রাস করছে এবং মানুষ সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করছে।
