নেপালে বন্যা: কাদা-ধ্বংসস্তূপে ব্যাপক তল্লাশি, নিহত বেড়ে ১০০৩, নিখোঁজ সাড়ে চার হাজার
আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজদের সন্ধানে মঙ্গলবারও (১ সেপ্টেম্বর) নেপাল ও চীনে উদ্ধারকারী দল কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের স্তূপে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালিয়েছে। ভয়াবহ বন্যার পর থেকে নিখোঁজ থাকা হাজারো মানুষের সন্ধানে এ তল্লাশি চালানো হয়। বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার তিন জনে পৌঁছেছে। সেইসঙ্গে সাড়ে চার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা মঙ্গলবার জানিয়েছে, দেশটিতে ৯৮৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯১৬ জন, যাদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি। চীনা কর্তৃপক্ষ রোববার সর্বশেষ দেওয়া তথ্যে জানিয়েছে, দেশটিতে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি।
গত সপ্তাহের ভয়াবহ দুর্যোগের ব্যাপকতা দুই অঞ্চলেই উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত করছে। ভূমিধস, সড়ক ধ্বংস এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে দুর্গম এলাকাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে তল্লাশি চালাতে গিয়ে উদ্ধারকারী দলগুলো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোতে উদ্ধারকারীরা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যায় ত্রিশূলি নদীসংলগ্ন কাদায় পূর্ণ সুড়ঙ্গের বিশাল নেটওয়ার্কে আটকা পড়া ছয় শতাধিক কর্মীর স্বজনেরা এখনও আশায় আছেন, প্রিয়জনদের হয়তো জীবিত ফিরে পাওয়া যাবে।
এর আগে, সোমবারও উদ্ধারকর্মীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালান। জীবিতদের উদ্ধারের সময় ফুরিয়ে আসছে—এমন আশঙ্কায় তারা পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরি করে ত্রিশূলি-থ্রিএ প্রকল্প এলাকায় ভেতরে বাতাস পাম্প করতে শুরু করেন।
প্রকল্প এলাকা থেকে নিখোঁজ ৩৩ বছর বয়সি প্রকৌশলী অরাস ভান্ডারীর স্ত্রী অনুশীলা ভান্ডারী বিবিসি নেপালিকে বলেন, 'আমি শুধু চাই যেন ওকে খুঁজে পাওয়া যায়। ও যেন অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসে।'
নেপাল ও চীন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫৫ জনে পৌঁছেছে। দুই দেশ মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৭১ জনে। এর মধ্যে অন্তত ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।
নিখোঁজদের প্রতি সাতজনের মধ্যে প্রায় একজনই বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সোমবার জানান, প্রকল্প এলাকাগুলো থেকে এ পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
চীন ও নেপালের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল এই উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এছাড়া ভারত, কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এতে যুক্ত রয়েছেন।
বন্যার সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত থাকা এক শ্রমিকের স্ত্রী সীতা পান্ডে নেপালি দৈনিক কান্তিপুরকে বলেন, 'আমার এখনও ৫০ শতাংশ আশা আছে যে ও বেঁচে আছে, কারণ ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।'
নেপাল পানিবিদ্যুতের ওপর বপয়াক নির্ভরশীল। পাহাড়ি নদীগুলোর ওপর এমন বহু প্রকল্প গড়ে তুলতে দেশটি বছরের পর বছর ধরে কাজ করে আসছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া কিংবা নির্মাণাধীন অন্তত ১১টি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সপ্তাহান্তেই উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গের ভেতর বাতাস পাম্প করা শুরু করেন। তবে ভেতরে আটকা পড়া ব্যক্তিদের পরিবার বলছে, এই পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
সোমবার সকালে উদ্ধারকারী একটি দল একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে ঢুকতে পারলেও কাউকে না পেয়ে ফিরে আসে।
প্রকল্পের ভেতরে আটকা পড়েছেন জীবন খড়কার স্বজন। তিনি কান্তিপুরকে বলেন, 'যত সময় গড়াচ্ছে, আমাদের আশাও তত ফিকে হয়ে আসছে। এই অভিযান আরও অনেক দ্রুত চালানো দরকার, কারণ প্রতিটি সেকেন্ডই এখন আমাদের জন্য মহামূল্যবান। উদ্ধারকাজ হতাশাজনকভাবে ধীরগতিতে চলছে।'
নেপালের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতা 'আরও জোরদার' করা হয়েছে। সেইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এই বন্যা কোনো 'স্বাভাবিক' ঘটনা নয়।
'এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে আমাদের ঝুঁকি কতটা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।'
উদ্বেগের সঙ্গে খবরের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছেন প্রিয়া খারেলও। বন্যার সময় তার ভাই মিলন আপার ত্রিশূলি-১ পানিবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি বিবিসি নিউজ নেপালিকে বলেন, 'জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে যারা ফিরে এসেছেন, তারা জানিয়েছেন যে সুড়ঙ্গের ভেতরে লোকজন আছেন। তাই সেনাবাহিনী দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছাতে পারলে হয়তো তাদের বাঁচানো সম্ভব—এই আশা এখনও রয়ে গেছে।'
দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ উদ্ধার তৎপরতায় পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স। তিনি জানান, উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গগুলোর সন্ধান পেতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
বিবিসি রেডিও ৪-এর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'সুড়ঙ্গগুলোর বাস্তব কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই—সবকিছুই হারিয়ে গেছে। চারপাশ দেখতে অবিকল চাঁদের পৃষ্ঠের মতো বিধ্বস্ত লাগছে।'
ডিক্স জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত হতে পারলে উদ্ধারকর্মীরা সেখানে পৌঁছানোর সবচেয়ে ভালো উপায় নির্ধারণ করতে পারবেন। সাধারণত এসব উপায়ের মধ্যে মাটি খোঁড়া ও 'বিশালাকার পাথর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া' অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ইন্টারন্যাশনাল টানেলিং অ্যাসোসিয়েশনের এই সাবেক প্রধান বলেন, 'এখানে এমন সব পাথর রয়েছে, যা একেকটি বাড়ির চেয়েও বড়। জীবনে আমি এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি। এটি সত্যিই নজিরবিহীন অভিযান।'
তিনি আরও জানান, ভূগর্ভস্থ পরিবেশ হয়তো ওপরের ভয়াবহ প্লাবন থেকে তাদের কিছুটা সুরক্ষা দিতে পেরেছে—এই বিবেচনায় মাটির নিচে আটকা পড়া মানুষদের বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশা তিনি এখনও দেখছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিবিসি নেপালিকে জানান, এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৯০০ মরদেহের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।
বন্যা যেখানে প্রথম আঘাত করেছিল, সেখান থেকে নদীর গতিপথে অনেক ভাটিতে অবস্থিত চিতওয়ান জেলা। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো প্রায় ৩০০ মরদেহ এ জেলার তীরে ভাসিয়ে নিয়ে আসার পর সেখানে অস্থায়ীভাবে গণকবর দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাস্কসহ সাদা পিপিই পরিহিত কর্মীরা অজ্ঞাতপরিচয় লাশগুলো ট্রাকে তোলার সময় বাতাস পচা মরদেহের তীব্র দুর্গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল।
সপ্তাহান্তে শহরের বাইরের বনাঞ্চলের একটি বড় অংশ খনন করা হয়। সেখানে চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অজ্ঞাত মরদেহের অবশিষ্টাংশ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চালান। প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বিবিসি নেপালিকে জানান, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তীতে পরিচয় নিশ্চিত করা গেলে স্বজনেরা তাদের প্রিয়জনদের দেহাবশেষ তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, 'মরদেহ সংরক্ষণের জন্য আমাদের এখানে পর্যাপ্ত ফ্রিজার নেই...তাই বাধ্য হয়ে শেষ বিকল্প হিসেবে এই অস্থায়ী সমাধি ব্যবস্থা বেছে নিতে হয়েছে। পরিস্থিতি সত্যিই আমাদের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।'
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। তবে চীনে এই বন্যার ভিডিও ও তথ্যের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবের চেয়ে হতাহতের সংখ্যা বাস্তবে অনেক বেশি—এমন দাবি করে ইন্টারনেটে যারা পোস্ট করছেন, তাদের ওপর 'প্রশাসনিক শাস্তি' জারি করছে চীনা কর্তৃপক্ষ। এই শাস্তির আওতায় সতর্কবার্তা ও জরিমানা থেকে শুরু করে স্বল্পমেয়াদি আটকাদেশ পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে নেপালেও বন্যা সম্পর্কিত যেসব অনলাইন বিষয়বস্তুকে কর্তৃপক্ষ বিভ্রান্তিকর তথ্য বলে মনে করছে, সেগুলো ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
