মর্গের সংকট, লাশের স্তূপ: নেপাল পরিণত হয়েছে গণকবরে, নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ
নেপালের পাহাড়ি গিরিপথগুলোতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানার পাঁচ দিন পরও দূরদূরান্ত থেকে আসা স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের শনাক্ত করার মতো কিছু একটা খুঁজছিলেন। শত শত বিকৃত মরদেহের মধ্যে তারা যেকোনো একটি চিহ্ন, যা দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
নদীর স্রোতের নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত ভারতপুর শহরের একটি ভবনে নারী-পুরুষেরা ছোট একটি টেলিভিশন পর্দার দিকে তাকিয়ে নীরবে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ছবি একের পর এক দেখছিলেন।
এর পাশের আরেকটি সরকারি ভবনকে অস্থায়ী মর্গে পরিণত করা হয়েছিল। সেখানে রাখা হয়েছিল ওই পর্দায় দেখানো ২৭০টি মরদেহ। এর মধ্যে প্রায় সবগুলোরই পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বন্যার প্রথম আঘাত হানার স্থান থেকে ১০০ মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত ভারতপুর শহরের নদীতীরে ভেসে আসা মরদেহগুলো সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। আরও বেশিদিন সেগুলো সেখানে রাখাও সম্ভব ছিল না। তাই শহরজুড়ে অন্ধকার নেমে আসার আগেই মরদেহগুলো একটি বনাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে গণকবর দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
দাফনের স্থানে সুরক্ষাবর্ম পরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একে একে স্ট্রেচারে করে মরদেহ নামাচ্ছিলেন। পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছিল। কাছেই কংক্রিটে ভরা পাত্রের মধ্যে সারি করে রাখা ছিল ধাতব তৈরি নম্বরযুক্ত চিহ্ন—যেগুলো প্রতিটি কবরের পরিচয়চিহ্ন হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মাত্র একটি অংশের মরদেহ এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এতে একটি নির্মম বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় সময় রোববার রাত পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। অথচ কোনো দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রথম ৭২ ঘণ্টাকেই সাধারণত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চল ও তিব্বতের ওপর দিয়ে ভয়াবহ বন্যার স্রোত বয়ে যায়। একটি হিমবাহ পাহাড়ের গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার পর এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। সেই পতনের ফলে এত তীব্র ভূকম্পন তৈরি হয়েছিল যে, কর্মকর্তারা প্রথমে এটিকে ভূমিকম্প বলে মনে করেছিলেন।
এর ফলে সৃষ্ট বিশাল জল ও কাদার দেয়াল গ্রামবাসী, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং বিভিন্ন দেশের শত শত পর্যটক ও ভ্রমণকারীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাদের অনেকেই ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় সেখানে গিয়েছিলেন।
হাজার হাজার মানুষের এখনো ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন। পুরো শহর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
চলমান উদ্ধার অভিযানের বেশিরভাগ অংশই রসুয়ার বেশ কয়েকটি প্রধান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুরঙ্গগুলোতে কেন্দ্রীভূত। নেপালে বন্যার সবচেয়ে প্রথম ও ভয়াবহ আঘাতগুলোর কয়েকটি এই এলাকায় হেনেছিল। এর ঠিক নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত নুওয়াকোটেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সেই রাতেই বৃষ্টির মধ্যেই সেনাবাহিনী ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে চাপা পড়ে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলোর কাছে পৌঁছাতে খননকাজ চালিয়ে যায়।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেতের বরাতে জানা যায়, রোববার বিকেলের মধ্যে ভারতীয় উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় তারা একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। তবে সুড়ঙ্গটি পানিতে পুরোপুরি পূর্ণ ছিল।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, 'নেপাল সেনাবাহিনী জীবিতদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পেতে তাপ শনাক্ত করতে সক্ষম ড্রোন ব্যবহার করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো জীবিত মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।'
বন্যার স্রোতের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, প্রায় এক ডজন মরদেহ শত শত মাইল দূরে ভেসে গিয়ে ভারতে পাওয়া গেছে।
চিতওয়ান জেলার নদীতীরে যখন মরদেহ ভেসে আসতে শুরু করে, তখন বন্যার প্রথম আঘাতের স্থান থেকে কয়েক ডজন মাইল দূরে থাকা ওই এলাকার কর্মকর্তারা দ্রুতই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে শুরু করেন।
নেপাল অত্যন্ত দরিদ্র একটি দেশ এবং দেশটির অবকাঠামোও সীমিত। চিতওয়ানের মর্গগুলোতে মাত্র ৩৬টির কিছু বেশি মরদেহ সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশপ্রধান রামেশ্বর পাউডেল।
ভালো কোনো বিকল্প না থাকায় জেলার কর্মকর্তারা ভারতপুরের সরকারি ভবনটির দ্বারস্থ হন।
ভবনটিতে মাত্র একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থাকায় কর্মকর্তারা শুষ্ক বরফ সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
তারা একটি সহায়তা ডেস্ক ও একটি দর্শনার্থী কক্ষ তৈরি করেন। পাশাপাশি মরদেহগুলোর ছবি তোলা শুরু করেন, যাতে নিখোঁজ স্বজনেরা আসতে শুরু করলে তারা ছবিগুলো দেখে প্রিয়জনদের শনাক্ত করতে পারেন।
কিন্তু মরদেহগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে ছিল। তার ওপর বর্ষার গরম পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাদের কাছে যেসব হিমায়িত সংরক্ষণযন্ত্র চেয়েছিলেন, সেগুলোও দ্রুত এসে পৌঁছাচ্ছিল না।
মাত্র প্রায় এক ডজন মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল এবং সেগুলো দাফনের জন্য পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
এরপরও আরও মরদেহ ভেসে আসতে থাকে।
অস্থায়ী মর্গে দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা বলেন, 'আমরা এখনো প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি নতুন মরদেহ খুঁজে পাচ্ছি। এভাবে কয়েক মাস ধরে চলতে থাকবে।'
শনিবার জেলা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে, মরদেহগুলো যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া শেষ করার পর সেগুলো দাফন করা শুরু হবে।
এই নথিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে মরদেহের ছবি তোলা, শরীরের বিশেষ কোনো চিহ্ন বা মরদেহের সঙ্গে পাওয়া পোশাকের বিবরণ লিখে রাখা এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সবুজে ঘেরা একটি বনাঞ্চলে, শহর থেকে গাড়িতে ১০ মিনিটের দূরত্বে, শনিবার গভীর রাতে ৯৩টি মরদেহ দাফন করা হয়।
পরদিন আরও ১০০টি মরদেহ দাফন করা হয়।
রোববার সন্ধ্যায় গণদাফনের শেষ পর্যায়ের কাজ চলার সময় ১৭ বছর বয়সী বীরেশ কুমার সাহ আট ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে শহরের অস্থায়ী মর্গে পৌঁছান।
বন্যায় তার নিজ শহর সিরাহায় আঘাত হানার খবর যখন তিনি প্রথম শুনেছিলেন, তখন তিনি নেপালের রাজধানীতে পড়াশোনা করছিলেন।
তার বাবা একজন গণিতের শিক্ষক এবং তার ছোট ভাই, যে একই স্কুলে পড়ত, দুজনই নিখোঁজ ছিলেন।
তিনি বলেন, 'প্রথম দিন আমি বিষয়টি উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি সবার কাছ থেকে খবরটি গোপন রেখেছিলাম।'
তিনি বলেন, 'আমি এখনো আশা ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।'
দ্বিতীয় দিনে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বাবা নিখোঁজ হওয়ার কথা জানান।
তিনি বলেন, 'তার একজন সহকর্মী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানান, তিনি আমার বাবা ও ভাইকে বন্যার স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি জানি তারা আর নেই। কিন্তু তারপরও আমি আশা ছাড়িনি।'
তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তার এক চাচি বলেন, পরিবারের সদস্যদের এখন উদ্ভূত বাস্তবতা মেনে নিতে হবে এবং শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিতে হবে।
বীরেশ সঙ্গে সঙ্গে তার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেন। তিনি বলেন, 'আমি এসব শেষকৃত্যের রীতি জানি না। আমি খুবই অসহায় বোধ করছি।'
৩১ বছর বয়সী রমেশ দাহালও ওই টেলিভিশন পর্দায় দেখানো মরদেহগুলোর ছবি দেখেছিলেন।
এর আগে আহতদের যেসব হাসপাতালে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সবগুলোতে খোঁজ নেওয়ার পর তিনি ভারতপুরে এসেছিলেন।
তিনি তার ২১ বছর বয়সী ভাতিজা সুমান দাহালকে খুঁজছিলেন। সুমান একজন গাইড ছিলেন এবং রসুয়ায় একদল পর্বতারোহী ও পর্যটককে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
দাহাল বলেন, বন্যার স্রোত নেমে আসার সময় কিছু মানুষ জঙ্গলের উঁচু এলাকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন—এমন খবর শোনার পর তিনি প্রথম দিকে আশাবাদী ছিলেন।
তিনি ধারণা করেছিলেন, হয়তো তারা হিমবাহের পতনে সৃষ্ট ভূমিকম্পের মতো শক্তিশালী কম্পন অনুভব করেছিলেন এবং নিরাপদ কোনো স্থানে চলে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, 'হয়তো তারা চীন থেকে কোনো সাইরেনের শব্দ শুনেছিল।'
তবে প্রতিটি দিন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন, বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'এখন মনে হচ্ছে, তার মরদেহটাও খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো শূন্য দশমিক এক শতাংশ।'
