সংলাপ সংকট বলিউডে, মান ধরে রেখেছেন কেবল শাহরুখ খান
'বাড়ে বাড়ে দেশো মে অ্যায়সি ছোটি ছোটি বাতে হোতি রেহতি হ্যায়', 'মোগাম্বো খুশ হুয়া', কিংবা 'কিতনে আদমি থে?—হিন্দি সিনেমার এই সংলাপগুলো কেবল রূপালী পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাধারণ মানুষের মুখ থেকে শুরু করে হাসি-ঠাট্টা ও মিমিক্রিতে ব্যবহার হতে হতে এগুলো একসময় দৈনন্দিন জীবনের নিজস্ব শব্দভাণ্ডারে রূপ নেয়। তবে বলিউডের পুরোনো স্বর্ণযুগ থেকে বর্তমানের ওটিটি যুগে আসার মাঝপথে শাহরুখ খানই হয়ে ওঠেন এমন একজন শেষ সুপারস্টার, যার মুখের সংলাপ সিনেমার চেয়েও বেশি পপ-কালচারে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
'ডর' সিনেমার 'ক-ক-ক-কিরণ' থেকে শুরু করে 'ওম শান্তি ওম'-এর সেই আইকনিক 'পিকচার অভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত'—শাহরুখ এমন সব সংলাপ আওড়েছেন, যা সাধারণ মানুষ সিনেমার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনেও অনায়াসে ব্যবহার করতে পারে। এমনকি ২০১৭ সালের 'রইস' সিনেমার 'কই ধান্ধা ছোটা নেহি হোতা'—সংলাপটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে স্রেফ তার অনবদ্য বাচনভঙ্গি এবং বাস্তব জীবনে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুবিধার কারণে।
গত এক দশকের দিকে তাকালে এমন কোনো সিনেমা বা অভিনেতার সন্ধান পাওয়া দুষ্কর, যাদের সংলাপ এমন কালজয়ী মর্যাদা পেয়েছে। আর এটি কেবল চিত্রনাট্যে দুর্বল সংলাপের কারণে হয়নি। আগে সংলাপ লেখার ভেতরে এমন এক ছন্দ রাখা হতো যাতে সাধারণ দর্শক বা কৌতুকশিল্পীরা জীবনের নানা মুহূর্তে তা ব্যবহার করতে পারতেন।
২০১৩ সালের 'ইয়ে জাওয়ানি হে দিওয়ানি' সিনেমায় রণবীর কাপুরের সেই ডায়লগ—'ম্যায় উড়না চাহতা হূঁ, দৌড়না চাহতা হূঁ, গিড়না চাহতা হূঁ... বাস রুকনা নেহি চাহতা হূঁ'—যা মধ্যবিত্ত তরুণেরা যখন জীবনে আটকে পড়া অনুভব করত, তখন নিজেদের স্বপ্নের সঙ্গে মেলাতে পারত। কিংবা 'জাব উই মেট' সিনেমায় কারিনা কাপুরের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ—'ম্যায় আপনি ফেভারিট হূঁ'।
এই লাইনগুলোতে ছিল এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া এবং নির্ভেজাল সহজ সরল অনুভূতি। তাই তো কলেজের প্রথম দিনে নিজেকে সবার কাছে স্মার্ট প্রমাণ করতে, স্বজনদের আড্ডায়, বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতে কিংবা স্রেফ কৌতুক করতে গিয়েও এই সংলাপগুলো অনায়াসে বলে ফেলা যেত। বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী বলেই এগুলো আজ এতদিন পরেও টিকে আছে।
এবার এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ব্লকবাস্টার 'অ্যানিম্যাল' সিনেমার সংলাপ তুলনা করা যাক। সিনেমাটির এমন কোনো লাইন কি ঝটপট মনে পড়ে যা পরিবার বা বন্ধু মহলের আড্ডায় ক্যাজুয়ালি ব্যবহার করা যায়?
বিগত দিনে অমিতাভ বচ্চন তার কণ্ঠের গাম্ভীর্য দিয়ে 'মার্দ' (১৯৮৫) সিনেমার 'মর্দ কো দরদ নেহি হোতা' কিংবা 'দিওয়ার', 'জঞ্জীর' ও 'ডন'-এর মতো সিনেমা দিয়ে সাধারণ বাক্যকে কালজয়ী স্টেটমেন্টে পরিণত করেছিলেন। সানি দেওলের 'তারিখ পে তারিখ' কিংবা 'ডাই কিলো কা হাথ'—কথাগুলো কেবল ডায়লগ নয়, তার ব্যক্তিত্বের সমার্থক হয়ে ওঠে।
ঠিক একইভাবে পরেশ রাওয়ালের 'বাবু রাও' চরিত্রের সংলাপ 'বাবু রাও কা স্টাইল হ্যায়'—ইন্টারনেটে 'মিম' ধারণার প্রবর্তনের আগেই তরুণদের মুখে মুখে মিম হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা
বলিউডের পুরোনো প্রজন্ম আমাদের দিয়েছিল দশকের পর দশক মনে রাখার মতো ডায়লগ, আর শাহরুখ খান আমাদের দিলেন প্রতিদিনের সাধারণ আলাপে ব্যবহার করার মতো ভাষা।
তবে শাহরুখের পর আর কোনো স্মরণীয় সংলাপ আসেনি তা বলা ভুল হবে। 'গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ২'-এ নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর সেই হুংকার 'বাপ কা, দাদা কা, ভাই কা, সবকা বদলা লেগা রে তেরা ফায়সাল' কিংবা 'উরি'-তে ভিকি কৌশলের 'হাউজ দ্য জোশ?'—বাঙালি সহ যেকোনো হিন্দি সিনেমার দর্শকমহলে বহুল চর্চিত। কিন্তু এই সংলাপগুলোর অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।
হুবহু সেই দৃশ্য পুনর্নির্মাণ করা ছাড়া হুট করে বন্ধুদের সামনে 'বাপ কা, দাদা কা...' বলা যায় না। কিন্তু মাস শেষে অ্যাকাউন্টে বেতন ঢুকলে বা জীবনে কোনো পরাজয়ের পর যেকোনো প্রেক্ষাপট ছাড়াই বলে দেওয়া যায়, 'কাভি কাভি কুছ জীতনে কে লিয়ে কুছ হারনা পড়েগা'।
স্মরণীয় সংলাপ ও কালজয়ী সংলাপের পার্থক্য ঠিক এখানেই।
আর এই কারণেই শাহরুখ খানকে সংলাপ-নির্ভর রোমান্টিক ও অ্যাকশন সুপারস্টারদের শেষ উত্তরসূরী মনে করা হয়। তার ঝুলিতে থাকা হিট সংলাপের তালিকা দীর্ঘ: 'রাহুল, নাম তো সুনা হোগা' (দিল তো পাগল হ্যায়), 'প্যায়ার দোস্তি হ্যায়' (কুছ কুছ হোতা হ্যায়), 'সাত্তার মিনিট' (চক দে! ইন্ডিয়া), 'ডন কো পকড়না মুশকিল হি নেহি, নামুমকিন হ্যায়' (ডন), 'কেহ দিয়া না, বাস কেহ দিয়া' (কাভি খুশি কাভি গম) কিংবা 'ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট দ্য পাওয়ার অব আ কমন ম্যান' (চেন্নাই এক্সপ্রেস)।
কমেডি, প্রেম, অ্যাকশন বা মোটিভেশন—ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপেই শাহরুখ এমন কিছু লাইন উপহার দিয়েছেন যা সাধারণ দর্শকরা নিজেদের ভেতরে ধারণ করে ঘুরে বেড়ায়। বচ্চন, অমরীশ পুরী কিংবা সানি দেওলের যুগের সেই ঐতিহ্যকে ইন্টারনেট যুগে সযত্নে টেনে এনেছেন একমাত্র কিং খান-ই।
