প্রথমে ভারতে নিষিদ্ধ, এবার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকেও উধাও গুম-খুন নিয়ে তৈরি ছবি ‘সাতলুজ’
খালিস্তানি আন্দোলনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিপীড়ন ও গুম-খুন নিয়ে তৈরি সিনেমা 'সাতলুজ' মুক্তির পরপরই ভারতে দেখানো বন্ধ করেছিল ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। এবার ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জিফাইভ-এর আন্তর্জাতিক তালিকা থেকেও সরিয়ে দেওয়া হলো দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত ছবিটি।
সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেতে বিস্তর টানাপোড়েন চলেছিল ছবিটির। প্রায় চার বছর আটকে থাকার পর গত শুক্রবার ওই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে 'সাতলুজ'-এর প্রিমিয়ার হয়। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই সরকারি নির্দেশে ভারত থেকে ছবিটি সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এত দিন ভারতের বাইরে দর্শকদের জন্য ছবিটি দেখার সুযোগ ছিল। এবার তা-ও বন্ধ করা হলো।
আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পরিচালক হানি ত্রেহানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তিনি খবরের সত্যতা স্বীকার করে সংক্ষেপে শুধু বলেন, 'হ্যাঁ।'
সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় ছবিটি জিফাইভের আন্তর্জাতিক তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জিফাইভের আন্তর্জাতিক তালিকা থেকে ছবিটি উধাও হওয়ার পরেই সমাজমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক্স হ্যান্ডলে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'তাহলে আন্তর্জাতিকভাবেও এটা সরিয়ে দেওয়া হলো।'
বিষয়টি নজর এড়ায়নি রেডিট-ব্যবহারকারীদেরও। প্ল্যাটফর্মটিতে এক ব্যবহারকারী লেখেন, 'আন্তর্জাতিকভাবেও জিফাইভ থেকে "সাতলুজ" সরানো হল। অর্থাৎ ভারতের বাইরেও আর এই ছবি দেখা যাবে না।'
সমাজমাধ্যমে মন্তব্যের ঘরে অনেকেই এই বিষয়ে কথা বলেছেন। একজন মন্তব্য করেছেন, 'সব জায়গায় নিষিদ্ধ করে আদতে ছবিটি আরও জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে। পাঞ্জাবি নন এমন অনেক বন্ধু আছেন, যারা নিষেধাজ্ঞার খবর পাওয়ার পরেই ছবিটি সম্পর্কে জেনেছেন এবং এখন দেখছেন।'
কেন সরিয়ে নেওয়া হলো 'সাতলুজ'?
ছবি মুক্তির ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে গত রোববার সন্ধ্যায় নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে 'সাতলুজ' সরিয়ে নেয় জিফাইভ। তারা একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেছে: 'বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতে "সাতলুজ" দেখা যাবে না। যথোপযুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব দর্শকদের কাছে ছবিটি ফিরিয়ে আনতে আমরা সব রকম আইনি পথ খতিয়ে দেখতে বদ্ধপরিকর।'
ছবিটি সরানোর বিষয়ে সহ-প্রযোজক রনি স্ক্রুওয়ালার প্রতিষ্ঠান আরএসভিপি মুভিজের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র সরকারি নির্দেশের কথা স্বীকার করে বলেন, 'সরকারই ছবিটি সরিয়ে দিয়েছে।'
এর আগে এনডিটিভিও সরকারি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল, ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ ছবিটির কিছু অংশ 'ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে'।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে 'পাঞ্জাব ৯৫' নামে কেন্দ্রীয় সেন্সর বোর্ড সিবিএফসি-তে কাছে ছবিটি জমা দিয়েছিলেন নির্মাতারা। কিন্তু সেন্সর বোর্ড ১২৭টি দৃশ্যে কাটছাঁটের করতে বললে তারা রাজি হননি। ওই কর্মকর্তা বলেন, সিবিএফসির সনদ ছাড়াই পরে নতুন নামে সরাসরি ওটিটিতে ছবিটি মুক্তি দেওয়া হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'প্রস্তাবিত কাটছাঁটের বিষয়টি নিয়ে নির্মাতারা দেরি করেন। শেষে নতুন নামে নীরবে ওটিটিতে ছবিটি রিলিজ় করে দেন। ওটিটি মাধ্যম সিবিএফসির এখতিয়ারভুক্ত নয়। বিষয়টি সরকারের নজরে আসতেই ছবিটি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় জি-কে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইন মেনে চলতে বলা হয়েছে ওই ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে বা ওটিটিতে মুক্তি দিতে হলে নির্মাতাদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই তা করতে হবে।'
ভক্তদের ডাউনলোড করা কপি ছড়িয়ে দিতে বলেছিলেন দিলজিৎ
'সাতলুজ' সরিয়ে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইনস্টাগ্রাম লাইভে এসে ডাউনলোড করা লিঙ্ক থেকে দর্শকদের ছবিটি দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। সেইসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের এই পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ছিল। সেজন্যই কোনো ধরনের প্রচারণা ছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্মে গেরিলা কায়দায় ছবিটি মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নির্মাতারা।
তিনি বলেন, 'এটি আপনাদের ছবি, আপনারা যেভাবে খুশি দেখতে পারেন।'
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়ার আগেই যে অনেক অনুরাগী ছবিটি ডাউনলোড করে নিয়েছেন, সে কথা জানতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন দিলজিৎ। তিনি বলেন, 'খুব ভাল করেছেন যে আপনারা ছবিটি ডাউনলোড করে নিয়েছেন। আমি আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলাম। জানতাম, এমনটাই হবে।'
এ সময় প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই অভিনেতা বলেন, 'লো কর লো ব্লক (পারলে ব্লক করে দেখাও), সবার কাছেই ডাউনলোড করা ছবিটা রয়েছে। এখন আপনারা কী করবেন? যারা ভাবেন যে ইন্টারনেট থেকে কোনো কিছু পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়, তারা হয় অশিক্ষিত, নাহয় অবুঝ।'
কী নিয়ে 'সাতলুজ'?
প্রথমে ছবিটির নাম ছিল 'ঘল্লুঘারা' (গণহত্যা)। পরে তা বদলে রাখা হয় 'পাঞ্জাব ৯৫'। ১৯৯০-এর দশকে খালিস্তানি আন্দোলনের সময় পাঞ্জাবে বহু মানুষকে বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ওইসব মানুষের হত্যাকাণ্ড ও সৎকারের তদন্তে নেমে ঘটনাগুলোর প্রকাশ্যে এনেছিলেন মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরা।
ওই সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তা প্রকাশ্যে আনতে এবং নথিবদ্ধ করতে যশবন্ত যে নিরলস লড়াই করেছিলেন, তা নিয়েই আবর্তিত হয়েছে এই জীবনীমূলক ছবিটি।
দিলজিৎ দোসাঞ্জ ছাড়াও 'সাতলুজ'-এ অভিনয় করেছেন অর্জুন রামপাল, সুবিন্দর ভিকি ও গীতিকা বিদ্যা ওলিয়ান।
কে এই যশবন্ত সিং খালরা?
যশবন্ত সিং খালরা ছিলেন পাঞ্জাবের মানবাধিকার কর্মী। রাজ্যে সন্ত্রাসবাদের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গোপনে মৃতদেহ দাহ করার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে এনে তিনি আলোচনায় উঠে আসেন।
১৯৫২ সালে অমৃতসর জেলার খালরা গ্রামে তার জন্ম। আশির দশকে তিনি পেশায় ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা। পরে সক্রিয়ভাবে মানবাধিকার রক্ষার কাজে জড়িয়ে পড়েন।
'অপারেশন ব্লু স্টার', তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা ও ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী দাঙ্গার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ যশবন্তকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ওই সময় বহু শিখ পরিবার অভিযোগ করে, জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহে পাঞ্জাব পুলিশ যাদের তুলে নিয়ে গেছে, তাদের আর কোনো খোঁজ মিলছে না।
২৫ হাজার 'বেওয়ারিশ' লাশ
একের পর এক মানুষ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হতে শুরু করায় সরকারি নথিপত্র থেকে তথ্য সংগ্রহে নামেন যশবন্ত। তার সেই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে অমৃতসর পৌরসভার নথিতে। সেখানে তিনি হাজার হাজার মানুষের নাম, বয়স ও ঠিকানাসম্বলিত এমন কিছু নথি পেয়েছিলেন, যাদের পুলিশ বেআইনিভাবে হত্যা করে পরিবারের অজান্তেই দাহ করেছিল।
ছবিতে যশবন্তের চরিত্রে অভিনয় করা দিলজিৎকে বলতে শোনা যায়, পাঞ্জাবে ২৫ হাজার 'বেওয়ারিশ' লাশ সৎকার করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৯০-এর দশকে সন্ত্রাসদমন অভিযানে সহযোগিতা না করায় প্রায় ২ হাজার পুলিশ কর্মকর্তাকেও হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
যশবন্তের এই অনুসন্ধানের জেরে বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় উঠে আসে। পাঞ্জাবে মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
১৯৯৫ সালে নিখোঁজ
তবে ১৯৯৫ সালে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান যশবন্ত। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাকে সর্বশেষ বাড়ির সামনে নিজের গাড়ি ধুতে দেখা গিয়েছিল।
১৯৯৬ সালে সিবিআই প্রমাণ পায়, তরন তারনের একটি থানায় তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। যশবন্তকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় পাঞ্জাব পুলিশের ৯ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চালানোর সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
২০০৭ সালের ১৬ অক্টোবর পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি মেহতাব সিং গিল ও বিচারপতি এ এন জিন্দাল-কে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ চার অভিযুক্তের সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।
