কলকাতায় হোটেলে ভয়াবহ আগুন, বাংলাদেশিসহ ৯ জনের মৃত্যু
কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিসহ অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ভেতরে থাকা অতিথিদের পক্ষে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় হোটেলের বেশিরভাগ অতিথিই ঘুমিয়ে ছিলেন।
নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৪০) ও তার পরিবারের আরও তিন সদস্য রয়েছেন। নিহত অন্যরা হলেন—দেবাশীষ দত্তের স্ত্রী আফশানা শিম্মিন (২৫), তাদের তিন বছর বয়সী শিশুপুত্র শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর মো. আকরাম আলী (৬৪)।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের দমকল মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নিহতদের মধ্যে ভারতীয় ও বাংলাদেশি—উভয় দেশের নাগরিকই রয়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারতের মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের নাগরিক রয়েছেন।
কৌশিক চৌধুরী বলেন, 'আমরা নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছি। ভবনের ভেতরের অবস্থা খুব খারাপ। এই ভবনের ভেতর বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। এখানে যা চলছিল, তা দেখে আমি স্তম্ভিত।'
তিনি আরও বলেন, 'ভবন কর্তৃপক্ষ ন্যূনতম নিরাপত্তা ও নির্মাণবিধি মেনে চলেনি। হোটেলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু অনিয়ম ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।'
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ৮০ জনকে উদ্ধার করে কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্রের বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলেছে, ভবনটিতে আগুন নেভানোর কোনো যথাযথ ব্যবস্থা ছিল না।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ভবনের মালিক বর্তমানে পলাতক।
শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিউ মার্কেটের কাছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি হোটেলে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলের একটি অংশও ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে যোগ দেয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনের ভেতরে আটকে পড়াদের বের করে আনতে কাজ করেন এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'প্রচুর ধোঁয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলাগুলোতে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হয়। এখন পর্যন্ত নয়জন মারা গেলেও মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।'
অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা অতিথিদের একজন আমিরুল ইসলাম। তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, 'সাহায্যের জন্য চিৎকার শুনে আমাদের ঘুম ভাঙে। জেগে দেখি চারদিকে ধোঁয়া। আমরা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিলাম। আমার যতটুকু মনে হয়েছে, আগুন নিচতলা থেকেই লেগেছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আমাদের নিরাপদে বের করে নিয়ে আসেন। তারা না থাকলে হয়তো বাঁচতাম না।'
নয়জনকে দ্রুত ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ করছে পুলিশ।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় বেশ কিছু হোটেল রয়েছে, যেখানে সাধারণত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অতিথি অবস্থান করেন।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার আরেক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন পর কলকাতার এই ঘটনা ঘটল। ১৭ আগস্ট ভোরে তারাপীঠের হোটেল বিদেশিনীতে আগুন লেগে অন্তত আটজন নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হন।
পাঁচতলা ওই হোটেলের নিচতলায় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যখন আগুন লাগে, তখন বেশিরভাগ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। হোটেলটি তারাপীঠ মন্দিরের কাছে পবিত্র পুকুরের (কুণ্ড) পাশেই অবস্থিত।
এই আগুনে মেঘালয়ের একই পরিবারের পাঁচ সদস্য মারা যান, যাদের মধ্যে দুটি শিশুও ছিল। জানা গেছে, পরিবারটি হোটেলের সর্বোচ্চ তলায় অবস্থান করছিল। আগুন লাগার বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা শিশুদের নিয়ে একসঙ্গে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নিচে নামার সময় তারা আগুনের কবলে পড়েন।
আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য রামপুরহাট সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
