ভারতে ২০ রুপি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ৩০ বছরের আইনি লড়াই, সুপ্রিম কোর্টে খালাস পেলেন দুই সরকারি কর্মচারী
ভারতে মাত্র ২০ রুপি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে ৩০ বছর পর। এই আইনি লড়াইয়ের ইতি ঘটিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গুজরাট সরকারের দুই কর্মীর সাজা বাতিল করে তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া ও বিচারপতি অতুল এস. চন্দুরকরের বেঞ্চ অভিযুক্ত ক্লার্ক ও পিয়নকে খালাস দিয়েছে। রায়ে বেঞ্চ বলেছে, ঘুষ চাওয়া হয়েছিল—এই বিষয় প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কেবল ২০ রুপি উদ্ধারের ভিত্তিতে কারও সাজা বহাল রাখা যায় না।
ঘটনাটি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির। শিক্ষাগত সুবিধা পেতে ইনকাম সার্টিফিকেটের জন্য আনন্দ জেলার বেচারি গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে যান এক শিক্ষার্থী।
সরকারি আইনজীবীর অভিযোগ ছিল, সার্টিফিকেট দেওয়ার বিনিময়ে ১২০ রুপি ঘুষ চেয়েছিলেন ওই ক্লার্ক—নিজের জন্য ১০০ রুপি ও পিয়নের জন্য ২০ রুপি।
এরপর দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে (এসিবি) অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগ পেয়ে কষে ফাঁদ পাতে এসিবি। তাদের দেওয়া দাগ-মারা, অর্থাৎ চিহ্নিত ১২০ রুপির নোট নিয়ে আবার পঞ্চায়েত অফিসে যান ওই ছাত্র।
সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার পর পিয়নকে ২০ রুপি দেন তিনি। ঠিক তখনই অভিযান চালায় রেইডিং দল। পিয়নের কাছ থেকে ওই দাগ-মারা ২০ রুপির নোট উদ্ধার হলেও, ক্লার্কের কাছে বাকি ১০০ রুপি পাওয়া যায়নি।
পুরো মামলায় সরকারি পক্ষের দাবিতে একাধিক অসংগতি খুঁজে পেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, ঘুষ চাওয়ার ব্যাপারে অন্য একটি জায়গায় ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছিলেন ওই শিক্ষার্থী। সেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, অভিযুক্তরা প্রথমে ২০০ রুপি চেয়েছিলেন, পরে ১২০ রুপিতে সমঝোতা হয়। বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এই দাবির উল্লেখই করেননি তিনি।
আরও একটি বিষয় সুপ্রিম কোর্টের নজরে আসে। এসিবি ওই ছাত্রকে নির্দেশ দিয়েছিল, ঘুষ চাইলে পুরো ১২০ রুপিই যেন দেওয়া হয়। অথচ তিনি শুধু ২০ রুপি দেন পিয়নকে।
ক্লার্ক ওই সময় পিয়নের পাশেই ছিলেন, তবু কেন বাকি ১০০ রুপি দেওয়া হলো না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।
জেরার সময় ওই শিক্ষার্থী এ-ও স্বীকার করেন, পিয়ন নিজে তার কাছে কোনো ঘুষ দাবি করেননি।
বেঞ্চ আরও পর্যবেক্ষণ করেছে, ইনকাম সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার পরেই পিয়নকে ওই ২০ রুপি দিয়েছিলেন ওই ছাত্র। এ কারণে সরকারি পক্ষের সাজানো ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে গভীর সন্দেহজনক মনে করে আদালত।
প্রিভেনশন অভ করাপশন অ্যাক্ট-এর একটি ধারার উল্লেখ করে আদালত বলেছে, যেহেতু ঘুষ চাওয়ার প্রাথমিক অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি, তাই পিয়নের কাছ থেকে শুধু ২০ রুপি উদ্ধার হওয়ার ঘটনা প্রসিকিউশনের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
বরং পিয়নের দাবিই আদালতের কাছে বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়েছে। পিয়ন বলেছিলেন, পরের দিন ঈদ হওয়ায় ওই ছাত্র তাকে ২০ রুপি দিয়েছিলেন।
পাশাপাশি ওই ক্লার্কের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর যে আইনি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেটিও অবৈধ বলে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কারণ একজন ক্ষমতাহীন অননুমোদিত কর্মকর্তা ওই অনুমোদন দিয়েছিলেন।
শেষপর্যন্ত নিম্ন আদালত ও গুজরাট হাইকোর্টের রায় বাতলি করে দিয়ে দুই সরকারি কর্মচারীকেই খালাস দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
