২০২৪-এর আগস্টে পটপরিবর্তনের পর সন্দেহভাজন জঙ্গিদের জামিনে মুক্তি; নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন জঙ্গি ও চরমপন্থির জামিনে মুক্তি আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিপ্রাপ্তদের কেউ কেউ ফের জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ও চরমপন্থি কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় একাধিক বোমা বিস্ফোরণ, বোমা উদ্ধার ও বোমা তৈরির আস্তানার সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় আবারও বাড়ছে উদ্বেগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মুক্তি পাওয়া সন্দেহভাজন জঙ্গিরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই চ্যালেঞ্জের একটি উদাহরণ হলো মাওলানা ইকরামুল হকের ঘটনা।
২০২৩ সালের ৩০ মে ঢাকার মাদারটেক থেকে গ্রেপ্তার হন ইকরামুল হক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের শাখা একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তি অন্তত পাঁচটি ছদ্মনামে পরিচিত: আবু তালহা, মাওলানা সাবেত, নূর হোসেন, মনসুর ও মিলন। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পাওয়ার আগপর্যন্ত তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন।
কিন্তু জামিনে মুক্তির পর প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তার এখনকার সুনির্দিষ্ট অবস্থানের তথ্য নেই।
জামিনে বের হওয়ার পর ছেলে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকার একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন বলে টিবিএসকে জানান ইকরামুলের বাবা মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন। কিন্তু কোন মাদরাসায়, সেটি তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ইকরামুল একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন বলে তিনি শুনেছেন এবং তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, ইকরামুল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং গ্রেপ্তারের আগপর্যন্ত ময়মনসিংহ থেকে একিউআইএসের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। ভারতে তার বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। প্রযুক্তিতে দক্ষ এই ব্যক্তি একিউআইএসের দাওয়াহ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং অনলাইনে সদস্যদের ক্লাস নিতেন বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ইকরামুলের বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না-ও হতে পারে।
সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সৃষ্ট অস্থিরতার সুযোগে একে একে কারাগার থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন জঙ্গি মামলার অনেক আসামি। এদের মধ্যে কেউ কেউ গোপনে সংগঠনের পুরনো সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।
শামসুল বলেন, 'আমরা তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছি।' জামিন পাওয়া আসামিদের নজরদারিতে রাখার চেষ্টা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সন্দেহভাজন সাবেক জঙ্গিদের কেউ কেউ এরই মধ্যে নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে দিয়ে থাকতে পারেন।
সিটিটিসি বলছে, নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা 'বোমারু মামুন' ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হন। ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তার তৈরি বোমা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে পুলিশের। ওই বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামুনসহ হোটেল ওলিও মামলার সব আসামিকে খালাস দেন আদালত।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গত ডিসেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল ও আশুলিয়ার কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তার সহযোগী আরিফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
১১ আগস্ট আরিফকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের শ্যামপুরে তার আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ১৩টি পাইপবোমা ও বোমা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধারের দাবি করে সিটিটিসি।
সিটিটিসি বলেছে, বোমারু মামুনকে ধরতে জোরালো অভিযান চলছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে সাম্প্রতিক বোমাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে তারা।
১৬ আগস্ট ডেমরা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তুসহ জুয়েল ভুঞা ওরফে 'ওস্তাদ' নামের আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কালো টেপে মোড়ানো প্রায় ছয় ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ওই বস্তু দুটি পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুয়েল ২০২৩ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। এরপর ২০২৪ সালে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যান। পরে তাকে আবার গ্রেপ্তার করে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে থাকার সময় মামুনের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর গত সেপ্টেম্বরে জামিনে কারাগার থেকে বের হন জুয়েল।
এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ওপর যথাযথ নজরদারি রাখা হচ্ছে কি না।
নতুন এক আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তার মধ্যে এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ১০ আগস্ট জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা সক্রিয় সেল গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে ঠিক কয়জন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি কোনো সংস্থাই। বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর অথবা তদন্তে নাম উঠে আসার পরই কেবল তাদের অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানা যাচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ অনেকেই নিয়েছে; জঙ্গিরাও সেই সুযোগ নেবে, সেটি অস্বাভাবিক নয়।
তিনি বলেন, 'এখন পুলিশের দায়িত্ব কে কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করা।'
জঙ্গিবাদের ঝুঁকি নিয়ে উদাসীনতা ও আত্মতুষ্টির সমালোচনাও উসকে দিয়েছে এই পরিস্থিতি। সাবেক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শেখ মোহাম্মদ সাজ্জাত আলী ২০২৫ সালের ১ জুলাই বলেছিলেন, 'বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই।' তার ভাষ্য ছিল, পুলিশের তখনকার মূল সমস্যা ছিনতাইকারী।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের আত্মতুষ্টির মূল্য দিতে হতে পারে। তিনি বলেন, সরকার এখনো জঙ্গিবাদ দমনে শক্ত অবস্থান প্রমাণ করতে পারেনি। সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা হামলা ও উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনক।
