চোখের সামনে নৃশংস ঘটনা দেখে মানুষ ভিডিও করে, কিন্তু প্রতিবাদ করে না
পরিচিত একজন সাপোর্ট স্টাফের বাসা আদাবর এলাকায়। সেদিন জানালেন তার ১০ বছরের ছেলেটা চোখের সামনে একজনকে কোপাতে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং ঘুমাতে পারছে না প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল।
তাদের বাসার সামনে দিনে-দুপুরে এই ঘটনা ঘটেছে। ছেলেটি তখন কেবল স্কুল থেকে এসে বন্ধুদের সাথে বাসার বাইরে খেলছিল। হঠাৎ চিৎকার, চেঁচামেচি শুনে কিছু বোঝার আগেই দেখলো একটা ছেলেকে মাটিতে ফেলে, আরো চার-পাঁচ জনে মিলে তাকে কোপাচ্ছে। আহত ছেলেটি পরে মারা গেছে।
শিশুটির মা চেঁচামেঁচি শুনে এসে বাইরে দাঁড়াতেই দেখে এই দৃশ্য। ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন মা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছেলেকে বুকে জাপটে ধরে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর থেকেই ছেলে খেতে পারছে না, স্কুল যেতে ভয় পাচ্ছে, বাইরে খেলতে যেতেও ভয় পাচ্ছে। মা-বাবা বুঝতে পারছেন না সন্তানকে কীভাবে স্বাভাবিক করে তুলবেন। এই একই অবস্থা ওর বন্ধুদেরও।
কেন নির্দয় হয়ে উঠছে এই সমাজ? কেন থামানো যাচ্ছে না অপরাধ? বাড়ছে খুন, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চুরি, ডাকাতি, এবং ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা। কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে 'চেইন অব কমান্ড' ভেঙে পড়েছিল, তাকে আবার লাইনে ফেরানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে সরকারের পক্ষে।
'চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার ৮৩০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৬ জন, আহত ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি। চলতি মাসেও সারা দেশে ১০টির বেশি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে গত দেড় বছরে সারা দেশে অন্তত ৭৪৮টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১৫৭ জন, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৮১ জন। অভিযোগ, অপরাধীদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া।' (সূত্র: আগামীর সময়)
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ১ মে থেকে ১৪ জুলাই প্রচুর পরিমাণে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের 'ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল এবং থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া থেকে দেশে ঢুকছে একের পর এক অস্ত্রের চালান। স্থল ও বঙ্গোপসাগরের অরক্ষিত অন্তত ১৫টি রুটে আসা চালানের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে ক্রিপ্টো কারেন্সিতে। এর বাইরেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে থেকে বড় বড় অস্ত্রের চালান নিয়ে এসেছেন অস্ত্র কারবারিরা। এরই মধ্যে এসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
এছাড়াও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারের বাইরে, ২৪ এর আগস্টের লুণ্ঠিত অস্ত্র এদের হাতে, কিশোর গ্যাং জোট বেঁধেছে এইসব দাগী সন্ত্রাসীদের সাথে, সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিরাও সেই সময়ের আইনশৃংখলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে পুঁজি করে বেরিয়ে এসেছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, চারিদিকে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য তৈরি হয়েছে। পুলিশের পক্ষে এদের নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধের বিচার না হওয়া বা বিলম্বিত হওয়ার পেছনে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে। বহুবছর ধরেই এমনটা হয়ে আসছে, সব সরকারের সময়ই প্রভাবশালী মহল বলে একটা মহল থাকে। এই মহল কারা, কীভাবে কাজ করে, কাদের দ্বারা কাজ করে এই তথ্য আইনরক্ষাকারী ব্যক্তিরা জানলেও বিভিন্ন কারণে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। শুধু রাজনৈতিক সরকার নয়, ২০২৪ এর অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরেও এই প্রভাবশালীদের চক্কর দেখা গেছে।
এই প্রভাবশালীদের কারণেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। অপরাধ করবে কিন্তু বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না, এটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্বের চেয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা, নারী ব্যবসা, প্রভাব বিস্তার এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই সাধারণত রাজনৈতিক সহিংসতার মূল কারণ।
এটাতো গেল রাজনৈতিক ও সামাজিক অপরাধজনিত ঘটনার হিসাব। এদিকে মহিলা পরিষদ বলছে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহসহ নারী ও কন্যাশিশুর ওপর প্রায় সব ধরনের সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কন্যাশিশুরা। আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ছয় থেকে নয় বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হওয়া খুবই উদ্বেগজনক।
মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, দেশে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ১ হাজার ৭১৯ জন নারী-কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। 'বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন চিত্র ২০২৫' শীর্ষক মহিলা পরিষদের আরেকটি সমীক্ষাতেও একই ধরনের ফলাফল উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করে নারীর প্রতি এই সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার পেছনে আছে বিচারহীনতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ও সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি।
বোঝা যাচ্ছে মানুষের উগ্র মনোভাব, প্রতিহিংসা, লোভ, আইনশৃংখলা ব্যবস্থার দুর্বলতা, অস্ত্রের চালান, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ এবং দখলের প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলেছে অপরাধ।
সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা নানাভাবে একে দেখছেন। তবে সবার কথার সারমর্ম হচ্ছে, মানুষ হঠাৎ করে সহিংস হয়ে উঠে না। কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষ সহিংস হয়ে উঠে। বিশেষ করে যখন কেউ বুঝতে পারে অপরাধের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না, তখন তারা আরো মরিয়া হয়ে অপরাধ করে।
পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অনলাইনে কিংবা ভিডিও গেমসে ভায়োলেন্স, মাদক ও অস্ত্রের সহজ প্রাপ্যতা, অসামাজিক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় থাকা, সাইকোপ্যাথ মানসিকতা, ক্ষমতার লোভ, চাহিদা ইত্যাদি কারণ মানুষের মনোজগতকে খুব বেশি তাড়িত করে।
মানুষ যখন সমাজবিরোধী ব্যক্তি কিংবা সাইকোপ্যাথ হয়ে ওঠে, তখন তারা নির্দ্বিধায় মানুষ ও পশুপাখি খুন করে, নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। কোনো অপরাধবোধ তাদের কষ্ট দেয় না। কষ্ট না পাওয়ার মনোভাবটাই ভয়ংকর। এই মনোভাবই মানুষকে আরো নৃশংস করে তোলে।
সমাজে এমনসব ভয়ংকর অপরাধ ঘটছে, দেখে মনে হয় যেন সত্যি নয়, ফিকশন। প্রকাশ্য দিবালোকে শত মানুষের সামনে কোপানো, বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ভাঙচুর করা, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্যাতিত ব্যক্তির কণ্ঠে বাঁচার আকুতি মানুষ শুনছেন, কিন্তু কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসছেন না। যেন কারো কোনো বিকার নেই। সবাই দেখছেন আর মোবাইলে ভিডিও করছেন এবং সবার সামনে দিয়ে বীরদর্পে পালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। সিসিটিভির ক্যামেরায় বা ভিডিওতে ধারণ করা এইসব নির্মম দৃশ্য দেখে সমাজ বিস্মিত হচ্ছে, ক্ষোভ প্রকাশ করছে—কিন্তু শাস্তি পেতে দেখছে না বা কম শাস্তি পেতে দেখছে। শাস্তি ঘোষণা হলেও নানান প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবায়ন আটকে থাকে। এই ফাঁকেই অপরাধী পার পেয়ে যায়।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের প্রতিবাদের নৈতিক ভিত্তিও নড়বড়ে হয়ে পড়ছে নানা কারণে। মানুষ এখন অহেতুক ঝামেলায় জড়াতে ভয় পান, তাই চোখের সামনে নৃশংস ঘটনা ঘটলেও তারা ভিডিও করেন, প্রতিবাদ করেন না। এরমধ্যে আমি, আপনি সবাই আছি।
আধুনিক সমাজের মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন। কেউ কারও বিপদে এগিয়ে আসেন না। গত ২০-২৫ বছরে একটু একটু করে পরস্পরকে সহযোগিতার হাত দূরে সরে গেছে এবং যাচ্ছে। তাই উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে অন্যায়, অপরাধ সব বাড়ছে নির্বিচারে। সবচাইতে বিপদজনক হচ্ছে অনেক সময় একজনের অপরাধ আরেকজনকে একই ধরনের অপরাধ করতে উৎসাহিত করে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলেন মানুষের মধ্যে পশু প্রবৃত্তি থাকে, সেই প্রবৃত্তিকে সিভিলাইজড বা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় নানা ধরনের নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে। আমাদের সমাজে এখন সেই নিয়ম-কানুন, মূল্যবোধ, আইনের প্রয়োগ সব দুর্বল হয়ে গেছে। সমাজের মধ্যে এত বেশি নেগেটিভ এলিমেন্ট ঢুকে গেছে যে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এখন রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব হচ্ছে সেই অপশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, সমাজকে নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা ও অপরাধীর যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা। শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলেই দূর হবে বিচারহীনতা এবং প্রভাবশালীর আধিপত্য।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
