আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে সহিংসতা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ
গত কয়েক মাসে ঢাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও ঝটিকা মিছিল নগরীর পুলিশের জন্য একটি উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: আগাম গোয়েন্দা সতর্কতা থাকার পরও কেন তারা বারবার সহিংসতার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছে?
টিবিএসের সঙ্গে আলাপকালে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বাহিনীর ভেতরে এখনো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী আতঙ্ক কাটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন পদায়ন-বদলি, নতুন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ঘাটতি, গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে দুর্বল সমন্বয় এবং পরে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে বিপদে ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একজন যুগ্ম কমিশনার টিবিএসকে বলেন, কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ এখনও ঘটনার তদন্ত করতে পারে। কিন্তু ঘটনার আগে জড়িতদের গতিবিধি শনাক্ত করে প্রতিরোধ করার সক্ষমতা আগের চেয়ে কমে গেছে।
সম্প্রতি গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক ঝটিকা মিছিলের সময় পুলিশের এই দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ বলেছে, তারা মিচিলতি ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি গোয়েন্দা সংস্থা আগস্টেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে মাঠে সক্রিয়তা বাড়তে পারে এবং অক্টোবর-নভেম্বরে তা আরও বিস্তৃত হতে পারে, এমন তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে এই সতর্কবার্তা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি বলে জানান কর্মকর্তারা।
প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে গুলশানের উপ-কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করে নেয় ডিএমপি।
তানভীর এক ব্যাচমেট টিবিএসকে বলেন, এই ডিসির কাছে তথ্য ছিল গুলশানে আওয়ামী লীগের একটি বড় জমায়েত হবে। ওই দিন সকালেই ওসিসহ পুরো ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তারা নামাজের পরে ছোটখাট মিছিল হবে, এমন ভেবে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেননি।
গুলশান গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্যও ছিলে না থানা পুলিশের কাছে। এছাড়া আতঙ্কের কারণেও পুলিশ মিছিলের মুখোমুখি হয়নি।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে 'পরিণতির' ভয়
একজন উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) নাম না প্রকাশের শর্তে টিবিএসকে বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ওই সময় পুলিশ সদস্যের মৃত্যু, থানায় হামলা ও পরে বিভিন্ন মামলায় পুলিশ সদস্যদের আসামি হওয়ার ঘটনা অনেক কর্মকর্তাকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগের একজন ডিসি বলেন, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পর ভবিষ্যতে সেই সিদ্ধান্তের দায় তাদের ওপর আসবে কি না, এমন চিন্তা মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, 'আওয়ামী আমলে ঊর্ধ্বতনেরা যা বলতেন, তা-ই বিনাবাক্যে পালন করতেন পুলিশের অধস্তনরা। কিন্তু ৫ আগম্টের পরে মামলা, চাকরি হারানো, বদলিসহ নানা বিষয়ে এখন নির্দেশনা মানতে চাইছেন না ওসি থেকে নিম্নপদের পুলিশ সদস্যরা।'
কর্মকর্তারা জানান, বেশ কিছু ঘটনায় নির্দেশনা দেবার পরে তা লিখিত দেবার জন্য অনুরোধও করেছেন কয়েকজন ওসি। এ নিয়ে গত কয়েক মাসে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাডার) ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের (নন-ক্যাডার) মধ্যে কিছুটা মনোমালিন্যও হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়হীনতাই প্রধান সংকট
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যায়ের দুই কর্মকর্তা বলেন, আগে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান হতো। এখন সেই সমন্বয় দুর্বল হয়েছে।
৫ আগস্টের পর পদায়ন হওয়া একজন ডিআইজি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখন পদায়ন, বদলি ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়েই ব্যস্ত।
'ফলে মাঠের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং এক ইউনিটের তথ্য অন্য ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করার মতো সময় ও মনোযোগ কিছুই নেই তাদের,' বলেন তিনি।
জঙ্গি নেটওয়ার্ক নজরদারির দায়িত্বে থাকা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একজন উপ-কমিশনার (ডিসি) জানান, তাদের এখন অন্য দায়িত্বে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, 'নিজেদের মূল কাজ ছাড়া নানা ধরনের দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ ও সম্ভাব্য সহিংস নেটওয়ার্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নজরদারিতে সময় দিতে পারছি না। আমাদের শীর্ষ মহলেরও সেদিকে আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না।'
একই ধরনের কাজ করা অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) অবস্থাও কাছাকাছি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমান সিটিটিসি-প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক যোগদানের পরে একবারও পুরো টিমের সঙ্গে বৈঠক করেননি।
এদিকে পুলিশের আরেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ২০২৫ সালের পুলিশ পদক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ওই তালিকায় শামসুল হক (বিপিএম-সার্ভিস) ও আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের (বাংলাদেশ পুলিশ পদক) নাম রয়েছে।
ওই বলেন, 'তালিকায় আমাদের ইউনিট-প্রধানের নাম দেখে অবাকই হয়েছি। তিনি এই পদে যোগদানই করেছেন চলতি বছরের মে মাসে। অথচ দেখলাম ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পদক পাচ্ছেন।'
'অনেকেই বিদেশে চলে যাবেন, আমাদের কী হবে?'
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, এমন অনিশ্চয়তাও নিচের স্তরের কিছু পুলিশ সদস্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর বাহিনীর ভেতর এ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফিরে আসবেন, এমন ধারণা পুলিশের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, ভবিষ্যতে কার সিদ্ধান্ত সঠিক বা ভুল হিসেবে বিবেচিত হবে, সেই অনিশ্চয়তাই তাদের মধ্যে বেশি কাজ করছে।
একজন ওসি টিবিএসকে বলেন, রকিবুলের এই উদ্বেগ আসলে অনেকেরই মনের কথা। 'তিনি খোলা মনে বলেছেন, তা আমাদের অনেকের মনেই আছে। তিনি বেফাঁসে বলে বিপদে পড়েছেন। কিন্তু আমরা কাউকে বলতে পারছি না। এখন যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রশাসন চালাচ্ছেন, সরকার বদল হলে তারা অনেকেই বিদেশে চলে যাবেন। নইলে সব সুবিধাসহ অবসরে যাবেন। আমাদের কী হবে?'
বাহিনীর কাজ সন্তোষজনক, দাবি পুলিশ নেতৃত্বের
২০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার 'মোটেই শঙ্কিত নয়'। যেকোনো ঘটনার পরপরই দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে বলেন, 'পুলিশ চাইলে তো ১ ঘন্টার মধ্যই সন্ত্রাসীদের ধরে ফেলতে পারে।' দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, '৫ আগস্টের পরে কোনো কারণে ঢিলেঢালা ভাব থাকতে পারে, ভয়ভীতি থাকতে পারে। এখন তো এটা থাকার কথা না; দেশে গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে।'
১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এসব বৈঠকের পর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও এসপিদের বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হবে, সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরইমধ্যে এক মাসের ব্যবধানে ঢাকার চার ওসিকে বদলি করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিটি থানা এলাকায় ২৪ ঘণ্টা পুলিশি টহল বাড়াতে বলা হয়েছে। রাত থেকে সকাল পর্যন্ত টহলে থাকতে হবে।
অন্যদিকে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বাহিনীর কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'আমি তো মনে করি আমাদের সাফল্য শতভাগ।'
