সমঝোতা চুক্তির ৬০ দিনে গোপনে ‘যুদ্ধ বাড়ানোর’ প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা নিরসনে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করার পরও, গত দুই মাস ইরান কূটনীতির চেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করতেই বেশি ব্যয় করেছে। গত রবিবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সমঝোতা স্মারকে নির্ধারিত ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। তবে এই আলোচনায় যুদ্ধ অবসানের কোনো অগ্রগতি হয়নি, বরং দুই পক্ষই মাঝেমধ্যে নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, এই সমঝোতা চুক্তিতে ইসরায়েল কোনো পক্ষ ছিল না।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে) ইরান ও আরব কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, তেহরানের বিশ্বাস ছিল—আমেরিকা ও ইসরায়েল মূলত ভবিষ্যতের একটি বড় হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময়ক্ষেপণ করছে এবং সেই সঙ্গে আগের দফার যুদ্ধের ধাক্কা থেকে বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কারণে গত ৬০ দিনে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কট্টরপন্থীদের নিয়োগ দিয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরও জানায়, আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে একটি 'কৌশলগত পরিবর্তন' লক্ষ্য করেছেন, যার উদ্দেশ্য হলো 'যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের বাহিনীকে প্রস্তুত করা।' তেহরানভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মোহাম্মদ হাসান সাংতারাশ পত্রিকাটিকে বলেন, 'ইরানে এখন এই ধারণা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মূল যুদ্ধটি এখনও শুরুই হয়নি।'
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ইসরায়েলি নেতাদের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসহ ইরানের তৈরি হুমকিগুলো মোকাবিলা করা এবং ইরানি জনগণের জন্য বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার 'অনুকূল পরিবেশ' তৈরি করা।
গত জুনে সমঝোতা চুক্তির অধীনে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে, ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজগুলোর ওপর পুনরায় হামলা শুরু করেছে। যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই প্রণালিটিই এখন মূল বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরব গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ইরান একদিকে যখন কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছিল, অন্যদিকে তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইরাক, ইয়েমেন এবং লেবাননে তাদের মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল।
জুলাই মাসে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদার করার আগে, আইআরজিসি তাদের সৌদি আরবের বন্দর ও জ্বালানি সাইটগুলোর একটি লক্ষ্যবস্তু তালিকা সরবরাহ করেছিল এবং আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিয়ে পরামর্শ দিয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২০ জুলাই হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেয়। হুথিদের দাবি, সৌদি আরব ইয়েমেনে যে অবরোধ তৈরি করেছে, তার জবাবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে রিয়াদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই নৌ-অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের হোদেইদাহ বন্দর নগরীতে হুথিদের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। সৌদি আরবের দাবি, এই স্থাপনাগুলো বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি ছিল। অন্যদিকে হুথিরাও এর জবাবে সৌদির তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে। হুথিদের এই লোহিত সাগর অবরোধ মূলত হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধেরই একটি পরিপূরক অংশ।
আরব কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে আরও জানিয়েছেন, আইআরজিসি ইতিমধ্যে তাদের আরব প্রতিবেশীদের কাছে জ্বালানি স্থাপনাগুলোর বিস্তারিত লক্ষ্যবস্তু তালিকা পাঠিয়েছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, আমেরিকা যদি ইরানের জ্বালানি সাইটগুলোতে আঘাত হানে, তবে ইরানও তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালাবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য একাধিকবার ইরানে বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েও পরবর্তীতে আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে পিছিয়ে এসেছেন। তিনি বারবার দাবি করছেন যে হরমুজ প্রণালি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যদিও সেখানে নৌ-যান চলাচল এখনও প্রায় বন্ধ রয়েছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এই জলপথ নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বারবার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ওয়াশিংটনের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এদিকে, তেহরান গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছে যে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের একটি বিকল্প রুটের বিষয়ে তারা একমত হয়েছে এবং দুই দেশ এই জলপথ যৌথভাবে পরিচালনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও কূটনৈতিক কোনো বড় অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য ইরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ একগুচ্ছ দাবি আমেরিকার সামনে উপস্থাপন করেছে।
