বায়োসিমিলার ও ভ্যাকসিন উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ার তাগিদ খাতসংশ্লিষ্টদের
বাংলাদেশকে জেনেরিক ওষুধ শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে বায়োলজিকস, বায়োসিমিলার, ভ্যাকসিন ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের ওষুধ উৎপাদনে সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত 'লাইফ সায়েন্স অ্যান্ড বায়োফার্মাসিউটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি' প্রণয়নের আহ্বান জানান। এতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্লিনিক্যাল গবেষণা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অভিন্ন অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তারা।
রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকায় বায়োটেড ও জেনএক্স আয়োজিত 'ফ্রম জেনেরিকস টু বায়োসিমিলারস অ্যান্ড ভ্যাকসিনস: বিল্ডিং বাংলাদেশস বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ এন রুট টু বায়োইকোনমি' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ছিল সমরু বায়োসায়েন্স।
পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা ও ক্লিনিক্যাল গবেষণা জোরদারের তাগিদ
মূল প্রবন্ধে জেনএক্স হেলথ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ড. মুনিয়া আমিন বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বৈশ্বিক ওষুধশিল্প দ্রুত বায়োলজিকস, বায়োসিমিলার, ভ্যাকসিন, রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন ও মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
"তাই শুধু উৎপাদনে গুরুত্ব না দিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি), ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন থেকে শুরু করে উন্নত বায়োলজিক্যাল ওষুধ উৎপাদন পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইনে সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকে," বলেন তিনি।
তিনি আন্তর্জাতিক মানের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সেন্টার, প্রশিক্ষিত গবেষক, জিসিপি-সম্মত ব্যবস্থা, ডেটা ম্যানেজমেন্ট, বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, বায়োঅ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরি এবং ফার্মাকোভিজিল্যান্স সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (ডিজিডিএ) আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে বায়োটেকনোলজি, মলিকুলার বায়োলজি, সেল কালচার, বায়োপ্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, জিএমপি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ক্লিনিক্যাল গবেষণায় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন ড. মুনিয়া।
সমরু বায়োসায়েন্স ইনকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঈন বলেন, বাংলাদেশকে জেনেরিক ও ছোট অণুভিত্তিক ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত বায়োলজিকস ও বায়োসিমিলারের দিকে এগোতে হবে।
তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে একটি 'লাইফ সায়েন্স অ্যান্ড বায়োফার্মাসিউটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি' প্রণয়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সেল-লাইন ডেভেলপমেন্ট, উন্নত বিশ্লেষণ, ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতায় যে ঘাটতি রয়েছে, তা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশগুলোর প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর অংশীদারত্বের মাধ্যমে পূরণ করা যেতে পারে।
মোহাম্মদ মঈন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন। এসব অবকাঠামো ব্যবহার করে বায়োসিমিলার সেন্টার অব এক্সিলেন্স, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং রিএজেন্ট উৎপাদন সুবিধা গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।
খাতটিতে কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে আগামী দুই বছরে প্রায় ১০ হাজার পেশাজীবীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি জাতীয় কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করবে সরকার
গোলটেবিল বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে বায়োলজিকস, বায়োসিমিলার ও ভ্যাকসিন খাতের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় কৌশল প্রণয়ন; পাইলট উৎপাদন, উন্নত বিশ্লেষণ ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য অভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা; এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে বাজারে চাহিদা তৈরি এবং দেশে উদ্ভাবিত পণ্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে বায়োফার্মাসিউটিক্যাল, ক্লিনিক্যাল গবেষণা ও বায়োটেকনোলজি খাতের জন্য একটি জাতীয় কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে সরকার।
তিনি বলেন, এ খাতের ভবিষ্যৎ শুধু স্বাস্থ্যসেবা ও ভ্যাকসিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় অর্থনীতির জন্যও এর উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠলে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমীদ আহমেদ বলেন, বায়োসিমিলার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সিকোয়েন্সিং ও বায়োইনফরমেটিকস দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশে। কোনো বায়োসিমিলার মূল ওষুধের মতো কার্যকর প্রমাণিত হলে অ্যাডাপটিভ ট্রায়াল পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল গবেষণা এগিয়ে নিতে আস্থা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।" আইসিডিডিআর,বির দীর্ঘ গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং ১০০টির বেশি ভ্যাকসিন ট্রায়াল পরিচালনার সক্ষমতা এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বায়োলজিকস ও বায়োসিমিলার খাতের উন্নয়নে একটি কেন্দ্রীয় গবেষণাগার ও অ্যানিমেল হাউস স্থাপন, শক্তিশালী কন্ট্রাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিআরও) ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা চালু এবং বায়োস্ট্যাটিস্টিশিয়ানের সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক ড. কাজী সাইফউদ্দিন বেননূর গবেষণায় 'ব্রেইন সার্কুলেশন' ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
