ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশেষ জোর: স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকারের বড় উদ্যোগ
স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে আগামী অর্থবছরের বাজেটে দ্বিগুণ বরাদ্দ প্রস্তাবের পর—হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে প্রাণঘাতী ক্যান্সার চিকিৎসার দেশেই সহজলভ্য করা, ডেন্টাল হাসপাতালের পরিসর বাড়ানো এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
দেশে প্রাণঘাতী ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ১২০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি দেশের ৮ বিভাগে নির্মাণাধীন ৮টি ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করে চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এছাড়া, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল ২০০ হতে ৩০০ শয্যায় এবং বগুড়ায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল ২৫০ হতে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এ তিনটি হাসপাতাল সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে আগামীকাল ২৪ জুন অনুষ্ঠিত বৈঠকে বসবেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সেবার মান, প্রয়োজনীয় সব সুবিধা এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে না।
দেশের স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়ন ও সবার জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা বিএনপি সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এজন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি ৫,০০০ চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে স্বাস্থ্যসেবা খাত ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর বরাদ্দের অর্থ যাতে অব্যায়িত না থাকে, সেজন্য অর্থবছরের শুরুতেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এর আগে উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৪২৭টি উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১,১৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে 'আরবান হেলথ কেয়ার ইন্টিগ্রেশন প্রজেক্ট' বা নগর স্বাস্থ্যসেবা সমন্বয় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই প্রকল্পের আওতায়, দেশের প্রধান দুই মেগাসিটিতে ১৭০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
শয্যার সাথে বাড়াতে হবে সক্ষমতা
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী ভর্তির অপেক্ষায় থাকলেও খালি হয় মাত্র ৬–৭টি বেড। ফলে জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মুমূর্ষু রোগী ভর্তি হতে পারেন না। ৫০০ বেডের একমাত্র বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতালটি বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ বাস্তবতায় হাসপাতালটিকে ১,২০০ বেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ বিষয়ে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, "বর্তমানে আমাদের হাসপাতালের সক্ষমতা ৫০০ শয্যার হলেও, প্রতিদিন রোগীর চাপ এর দ্বিগুণেরও বেশি। হাসপাতালটি ১,২০০ শয্যা করা হলেও আমাদের অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হবে। দেশের ক্যানসার রোগীর যে বাস্তব চিত্র, তাতে আমাদের আসলে একটি ২,০০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল প্রয়োজন।"
ডা সুমন বলেন, অন্যান্য হাসপাতালের সঙ্গে ক্যান্সার হাসপাতালের তুলনা করা যায় না। "অন্যান্য হাসপাতালে জ্বরের রোগী তিন দিন পর চলে যায়, বেড খালি হয়। কিন্তু ক্যান্সার রোগী একবার ভর্তি হলে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়। শিশু ক্যান্সার রোগীকে অনেক ক্ষেত্রে তিন মাস পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয়—এটাই ট্রিটমেন্ট প্রোটোকল।"
তবে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া শুধু শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না।
ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ও গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী, অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন টিবিএসকে বলেন, "দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু বেড বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে রেডিওথেরাপিসহ ক্যানসারের অন্যান্য সব ধরনের সেবা যেন রোগীরা পান, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।"
ডা. রাসকিন আরও বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ক্যানসারের প্রাথমিক স্ক্রিনিং (শনাক্তকরণ) ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা থাকা উচিত। আর জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে সব ধরনের ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, "ক্যান্সারের প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা, জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি ক্যান্সার সেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, গাইনি, অনকোলজি ও পেডিয়াট্রিক অনকোলজিসহ পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার সেন্টার গড়ে তুললে ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ওপর চাপ কমবে।"
বিভাগীয় পর্যায়ে যে নির্মাণাধীন ক্যানসার হাসপাতালগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করে সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আহ্বান জানান তিনি।
ক্যান্সার হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন আউটডোরে প্রতিদিন ১,২০০ থেকে ১,৫০০ রোগী সেবা নেয়। এরমধ্যে ভর্তির প্রয়োজন থাকা অধিকাংশ রোগীর ভর্তির ডেট পেতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়।
শয্যা সংকটের পাশাপাশি ক্যান্সার হাসপাতালে যন্ত্রপাতির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ডা. সুমন জানান, হাসপাতালে সাতটি রেডিওথেরাপি বাংকার থাকলেও—বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র দুটি মেশিন। ফলে রেডিওথেরাপির জন্য একজন রোগীকে এক থেকে দেড় বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, "আমাদের সিটি স্ক্যান মেশিন একটি, সেটিও কোনোমতে চলছে। এমআরআই মেশিন নেই। অপারেশন থিয়েটারে পর্যাপ্ত অ্যানেসথেশিয়া মেশিন নেই। এমনকি গ্লাভস, ক্যানোলা, স্যালাইন সেটের মতো মৌলিক জিনিসও অনেক সময় সংকটে পড়ে।"
ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় রেডিওথেরাপির কোর্স সম্পূর্ণ করা হয়, যা প্রাইভেট হাসপাতালে শেষ করতে প্রায় ২ লাখ টাকা লাগে।
জনবলের ঘাটতিও বড় সমস্যা। বর্তমানে ৩০০ বেডের জনবল দিয়ে হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি ২১০টি পদ অনুমোদন পেলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম বলে জানান কর্মকর্তারা।
"আমরা প্রায় ১,২০০ জনবল চেয়েছিলাম, কিন্তু অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ২১০ জনের," বলেন পরিচালক।
ডা সুমন মনে করেন, "শুধু বেড সংখ্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি বিস্তৃত উদ্যোগে যেতে হবে। পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি—সব একসাথে নিশ্চিত করতে হবে।"
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ক্যান্সার রোগী আছে ১৩ থেকে ১৫ লাখ। প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হয়। এছাড়া, বছরে মারা যায় প্রায় দেড় লাখ ক্যান্সার রোগী।
এই বিপুল সংখ্যক ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা মূলত ঢাকা কেন্দ্রিক, এর মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ওপর নির্ভরশীল। ক্যান্সারের চিকিৎসা দেয়া ৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে পাঁচটিতেই রেডিওথেরাপি মেশিন ঠিকভাবে কাজ করে না। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজেও রেডিওথেরাপি মেশিন নষ্ট, চাহিদা অনুযায়ী সার্ভিস দিতে পারে না অনকোলজি বিভাগ।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগে মাত্র একটি রেডিওথেরাপি মেশিন চালু রয়েছে। এটি দিয়ে প্রতিদিন ৭০ জন রোগীকে থেরাপি দেওয়া যায়। সেখানে প্রতিদিন রেডিওথেরাপি নেয়ার অপেক্ষায় থাকে ২০০ থেকে ৩০০ জন রোগী।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন টিবিএসকে বলেন, "একটিমাত্র রেডিওথেরাপি মেশিনে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন। ব্যাকআপ না থাকায়, এই মেশিনটি নষ্ট হলে চিকিৎসা বন্ধ থাকবে। রোগীদের যদি রেডিওথেরাপি পেতে তিন-চার মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে ক্যান্সারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।"
