দালালের দৌরাত্ম ও চিকিৎসায় অনিয়মে বিপর্যস্ত বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত, অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
মোহাম্মদপুরের কলেজ গেটে অবস্থিত টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতালের এনআইসিইউতে চারজন রোগী ভর্তি করা হলেও সেখানে কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। এসব রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে ভাগিয়ে আনা হয়েছিল।
হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স না থাকা, এনআইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে অপরিচ্ছন্নতা এবং দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে আনার অভিযোগে মঙ্গলবার হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানের সময় রোগীর স্বজনেরা জানান, অ্যাম্বুলেন্স চালক তাদের এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কেউ আবার সরকারি হাসপাতালের কর্মচারীর মাধ্যমে এখানে এসেছেন।
টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতালের মতো চানখারপুলের এডভান্সড হেলথ এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী আনার প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সেন্টারটি বুধবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া দালালকে ভুয়া চিকিৎসক সাজিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়ায় 'ডক্টরস কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার' নামের একটি হাসপাতাল সোমবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দরিদ্র ও কম শিক্ষিত মানুষই দালালদের শিকার হচ্ছেন বেশি
সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা নিতে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগীরা প্রায়ই দালাল চক্রের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। হাসপাতালের গেট, জরুরি বিভাগ ও আউটডোরে অবস্থান করা এই চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেক রোগী ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। জেলা সদর হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকার বড় বড় সরকারি হাসপাতাল—সবখানেই এই সমস্যা রয়েছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাজ্জাদুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সরকারি হাসপাতালে দালালের সমস্যা ভয়াবহ। আউটডোরে গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগীদের ব্যাংকের মাধ্যমে বিল পরিশোধে সহায়তা করা বা মিষ্টি করে কথা বলে তারা বোঝান—এখানে ভিড় বেশি, পরীক্ষা করতে দেরি হবে, অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কম সময়ে টেস্ট করিয়ে এনে দেবে বা ভালো ডাক্তার দেখাবে।"
"তারা এমনভাবে রোগীর স্বজন সেজে থাকেন যে অপরিচিত পরিবেশে আসা মানুষগুলো বুঝতেই পারেন না। দুইটা মিষ্টি কথা বললেই রোগীর পরিবার কনভিন্স হয়ে যায়। এদের টেকনিক এত নিখুঁত যে সহজে ধরা যায় না," বলেন ডা. সাজ্জাদুর রহমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীদের সচেতন করা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, আইসিইউ ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণ, নিয়মিত গোপন নজরদারি এবং দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া এই চক্র বন্ধ করা সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সারাদেশের হাসপাতালে রোগী নিয়ে দালালি বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি রোগীকে ট্রলিতে আনা-নেওয়া বা ভর্তি করাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার প্রথাও বন্ধ করা হবে। অনিয়মকারী ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করা হবে।
নিটোরে নজরদারি বাড়ানো হলেও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি দালাল
স্বাস্থ্য মন্ত্রীর নির্দেশে গত ২৩ মার্চ থেকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দল। বুধবার আটটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সাতটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ, দুটি আংশিক বন্ধ এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়। ২৩ মার্চ একটি হাসপাতাল বন্ধ করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "দালালের দৌরাত্ম আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যতদিন ডিমান্ড-সাপ্লাই গ্যাপ থাকবে—মানে সবাইকে আইসিইউ বা সব ধরনের পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না—ততদিন পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন।"
তিনি বলেন, হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই দালালরা রোগীদের বাইরে নিয়ে যায়। "আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আনসার ও আমাদের নিজস্ব স্টাফদের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। নিয়মিত বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে।"
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ আগে দালালের দৌরাত্ম বেশি ছিল। তবে কয়েক মাসে তা অনেকটাই কমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "২০২৪ সালের আগস্টে পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রতিদিন কয়েকটি দালাল-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হতো। এখন তা অনেক কমেছে। আনসার, ওয়ার্ড মাস্টার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় অভিযানও চালানো হয়।"
তিনি বলেন, প্রশাসনিক ও ইভিনিং মনিটরিং টিম গঠন এবং নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনের ফলে দালালদের তৎপরতা কিছুটা কমেছে। "তবে একেবারে শেষ হয়ে গেছে—এটা বলা যাবে না।"
