ওষুধ আবিষ্কার ও প্রবৃদ্ধির খোঁজে চীনের দিকে ঝুঁকছে জাপানি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ওষুধের বাজার চীনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে জাপানি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো। সম্ভাবনাময় নতুন ওষুধের সন্ধান পেতে চীনা অংশীদারদের দ্রুত উন্নত হতে থাকা ওষুধ আবিষ্কারের (ড্রাগ ডিসকভারি) সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই মূলত জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো এই নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।
এরই অংশ হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্টেলাস ফার্মা চলতি বছরের মধ্যেই বেইজিংয়ে একটি নতুন গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) কেন্দ্র খুলতে যাচ্ছে, যা চীনে এই কোম্পানির প্রথম গবেষণা কেন্দ্র হতে যাচ্ছে।
বেইজিং ও সাংহাইতে কোম্পানিটির ইতিমধ্যেই বিপণন (সেলস) এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সুবিধা রয়েছে, পাশাপাশি শেনিয়াংয়ে রয়েছে একটি উৎপাদন বেইজ। বেইজিংয়ের নতুন এই আরঅ্যান্ডডি হাবটি মূলত নতুন ওষুধ আবিষ্কারের কাজটি পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে, দাইইচি সানকিও নামের আরেক কোম্পানি ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে সাংহাইতে একটি ওষুধ উৎপাদন কারখানার কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে চীনে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ১১০ কোটি ইউয়ান (১৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করছে।
এই কারখানায় কোম্পানিটির ক্যানসারের চিকিৎসায় তাদের ফ্ল্যাগশিপ পণ্য বা ওষুধ 'এনহার্টু' এবং 'ড্যাট্রোওয়ে' নামক একটি নতুন ক্যানসারের ওষুধ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে; যা থেকে আগামীতে বড় অঙ্কের আয়ের প্রত্যাশা করছে দাইইচি সানকিও।
এই অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেটস (এডিসি) ওষুধগুলো নির্দিষ্ট কিছু গ্যাস্ট্রিক ও স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যেই চীনে অনুমোদন পেয়েছে। জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির পর চীন হবে চতুর্থ দেশ, যেখানে দাইইচি সানকিও তাদের অত্যাধুনিক এডিসি উৎপাদন চালু করতে যাচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ওষুধ তৈরিতে নতুন 'ব্রেকথ্রু' বা যুগান্তকারী সাফল্যের তাগিদে এই ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো চীনে তাদের তৎপরতা ও বিনিয়োগ দ্বিগুণ করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি সাধন করেছে। দেশটির সরকার নতুন ওষুধ গবেষণাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এই খাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কারই এখানে মূল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ -এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ক্যানসার চিকিৎসার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বিশ্বসেরা অবস্থানে ছিল চীন।
তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল এবং এইসাই-এর মতো শীর্ষ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন ও সম্ভাবনাময় ওষুধের পরিধি বাড়াতে চীনের বিভিন্ন আধুনিক বায়োটেক কোম্পানির সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
তাকেদার প্রেসিডেন্ট ও সিইও ক্রিস্টোফ ওয়েবার বলেন, চীনের ওষুধ উন্নয়নের মাত্রা খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কম উৎপাদন খরচ এবং দ্রুততম সময়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করার মতো বিশেষ সুবিধার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আইকিউভিআইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালেই চীনের ওষুধের বাজার জাপানকে ছাড়িয়ে যায় এবং বর্তমানে এটি বৈশ্বিক তালিকায় কেবলমাত্র আমেরিকার পেছনে রয়েছে। ২০২৪ সালে চীনে ওষুধ খাতে মোট ব্যয় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি (১৬৬ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের ১০ শতাংশ। দেশটির বিশাল জনসংখ্যার বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেখানে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পেছনে মানুষের ব্যয়ও দিন দিন বাড়ছে।
জাপানের একটি শীর্ষস্থানীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, "চীনাদের খাদ্যাভ্যাস দিন দিন পশ্চিমা ধাঁচের হয়ে ওঠায়— সেখানে জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে যেসব ওষুধ আগে উন্নত দেশগুলোতে ভালো চলত, সেগুলো এখন চীনেও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে।"
কোম্পানিটির তথ্যমতে, জাপানি ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট এইসাই 'ফুজি ইয়াকুহিন'-এর সাথে একটি লাইসেন্সিং চুক্তি সম্পাদন করেছে এবং গত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চীনে গেঁটেবাত-এর একটি বিশেষ চিকিৎসা বা ওষুধ বাজারে এনেছে। চীনে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই রোগে ভুগছেন।
এইসাই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, "আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।"
এদিকে বিশ্বের বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা নীতিতে বড় ধরনের ওলটপালটও জাপানি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে চীনের দিকে পা বাড়াতে বাধ্য করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন 'মোস্ট-ফেভারড-নেশন প্রাইসিং' ব্যবস্থা চালু করেছে, যার লক্ষ্য আমেরিকার ওষুধের দাম উন্নত দেশগুলোর সর্বনিম্ন মূল্যের সমপর্যায়ে নিয়ে আসা। বৈশ্বিক বাজারে এর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় আমেরিকার বাজারের নীতিনির্ধারণী ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জাপানের বাইরেও অন্যান্য বৈশ্বিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চীনে তাদের বিনিয়োগের অংক বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ-সুইডিশ প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকা, যারা ২০৩০ সালের মধ্যে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং উৎপাদন সুবিধা সম্প্রসারণে ১,৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। ক্যানসার চিকিৎসায় মার্কিন জায়ান্ট ফাইজারও চীনের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করছে।
তবে চীনে কার্যক্রম পরিচালনা করা জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য এখনও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। উদাহরণস্বরূপ, গত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশটিতে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগে অ্যাস্টেলাসের একজন জাপানি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে চীনের কর্তৃপক্ষ, আর এই ধরনের ভূরাজনৈতিক ঘটনা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি জিইয়ে রাখছে।
