সন্তানদের উচ্চশিক্ষায়, নতুন প্রযুক্তির ব্যবসার সম্ভাবনায় চীনে ছুটছে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী পরিবারগুলো
গত এপ্রিল মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পরিবার—যার মধ্যে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, তিন শিশু এবং একজন আয়া ছিলেন—চীনে সাত দিনের একটি শিক্ষামূলক ও ব্যবসায়িক সফরে—প্রায় ৩ লাখ ইউয়ান (৪৪,২২৮ মার্কিন ডলার) ব্যয় করেন। ইরান যুদ্ধ তাদের ফ্লাইট এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা বারবার ব্যাহত করার কারণে সফরটি প্রায় বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তবে সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা সাংহাইতে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
ওই পরিবারটির ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেয় মধ্যপ্রাচ্য-ভিত্তিক ট্যুর অপারেটর 'ইউফক্স ট্রাভেল'। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী লিলিয়ান লিউ বলেন, "এই সফরে আসার ব্যাপারে তাদের ইচ্ছা ছিল অটল। অথচ বছর কয়েক আগেও এই ধরনের গ্রাহকদের (ক্লায়েন্ট) অস্তিত্ব মেলা ছিল ভার।"
আগে লিলিয়ানের ব্যবসার ধরন ছিল একটি চেনা ছকে বাঁধা, যেখানে চীন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণকারীই থাকত বেশি। যেমন দুবাই বা আবুধাবির আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগে যাওয়া চীনা উদ্যোক্তা, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও জ্বালানি খাতভিত্তিক প্রকল্প পরিদর্শনে যাওয়া বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্তা, আর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণে ইচ্ছুক চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি ট্যুর বা শিক্ষাসফরের আয়োজন করা।
তবে চীনের দিকেও এখন বাড়ছে উপসাগরের ধনী আরবদের ঝোঁক। লিলিয়ান বলেন, গত শীতকালে এই পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন তিনি আবুধাবির একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর একটি দলের চীন সফরের আয়োজন করেন। ওই শিক্ষার্থীদের অনেকেই মধ্য ও উচ্চ আয়ের পরিবারের সন্তান ছিলেন। সফর শেষে সাংহাইয়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর চেয়ে ওই দলটিকে সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চিত করেছিল চীনের রোবোটিক্স শোরুম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বাস্তবমুখী প্রয়োগ এবং চীনের শহরগুলোর দৃশ্যমান আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো।
তিনি বলেন, "তারা অনেক প্রশ্ন নিয়ে এসেছিল। চীনের বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তির প্রধান বিষয়গুলো কেমন? এআই এবং রোবোটিক্স কতটা উন্নত? চীন তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের বিকাশের জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে কি না, তা যাচাই করতেই তারা মূলত আগ্রহী ছিল।"
এরপর থেকে লিউ আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ওমানের ধনী পরিবার ও স্কুলগুলোর কাছ থেকে ক্রমাগত বিপুল সাড়া পাচ্ছেন, যারা তাঁদের সন্তানদের চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রযুক্তি খাত এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ ঘুরে দেখানোর জন্য সাংহাই, হাংঝৌ ও শেনঝেনের মতো শহরগুলোতে পাঠাতে চান।
চীনে যাওয়ার নতুন এই চাহিদা একটি ব্যাপক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তরুণদের কাছে চীনের একটি ভিন্ন ও সমসাময়িক আধুনিক রূপ তুলে ধরছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন জ্বালানির গাড়ি (নিউ এনার্জি ভেহিকল) এবং উন্নত উৎপাদন শিল্পে (অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং) চীনের অভাবনীয় সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্প খাতকে চেনার এক অনন্য জানালা হিসেবে দেশটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একই সাথে চীন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সহজ ভিসা সুবিধা ভ্রমণকে আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছে।
চীনের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভিসা-মুক্ত নীতির সম্প্রসারণের পর ২০২৪ সালে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে চীনে আগমনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় এবং ২০২৫ সালেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের চায়না কালচার সেন্টার জানিয়েছে, গত বছর গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি-ভুক্ত ছয়টি দেশের ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি নাগরিক চীনে ভ্রমণ করেছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১০০ শতাংশেরও বেশি।
চলতি গ্রীষ্মে লিলিয়ান লিউয়ের টিম উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা একাধিক স্কুল গ্রুপ এবং পারিবারিক প্রতিনিধি দলকে আতিথেয়তা দেওয়ার প্রত্যাশা করছে। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, এই সব গ্রাহকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি প্রায় একই রকম: তাদের অভিভাবকেরা সাধারণত বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, জ্বালানি কোম্পানি, অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের উচ্চপদে কর্মরত অথবা কেউ কেউ পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ধনী গ্রাহকদের চোখে চীন এখন আর কেবলই কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক অংশীদার নয়; বরং এটি তাদের সন্তানদের শিক্ষার পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশলের জন্য একটি অন্যতম প্রধান ও সম্ভাবনাময় বিকল্পে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি নিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো কোনো সম্পদশালী পরিবার ইতোমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা ভাবছে। লিউ বলেন, "বেশ কয়েকজন গ্রাহক আমাকে বলেছেন, তাদের সমস্ত সম্পদ ও বিনিয়োগ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই রেখে দেওয়াটা দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে। তাই তারা বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে চীনে কীভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা যাচাই করে দেখছেন।"
চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে বিশেষায়িত শিক্ষাসফর ও বিনিময় কর্মসূচি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান 'নিংবো নিউ ওয়ে' -এর প্রতিষ্ঠাতা কেন্ট কাই জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও তিনি একই ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন।
কাই বলেন, "মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা আফ্রিকা—সব অঞ্চল থেকেই চীনে আসার আগ্রহ নিশ্চিতভাবেই দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে। সহজ ভিসা প্রক্রিয়া, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কম খরচের কারণে চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নাগালের মধ্যে চলে এসেছে।"
এর প্রভাব কেবল শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কাই বলেন, "যত বেশি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার চীনে আসবে, সময়ের সাথে সাথে তা তাদের নিজ দেশে বাণিজ্য, ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং চীনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে তত বেশি প্রভাব ফেলবে।"
লিলিয়ান লিউয়ের মতে, এই বাজারটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর ভবিষ্যৎ গতিপথ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমানে শিক্ষাসফর এবং ব্যবসায়িক পরিদর্শন একীভূত হয়ে একটি একক প্যাকেজে পরিণত হচ্ছে: অর্থাৎ একই সফরে এসে সন্তানরা যখন স্কুল ও প্রযুক্তি প্রদর্শনী ঘুরে দেখছে, তখন অভিভাবকেরা চীনের বাজার এবং বিভিন্ন শিল্প খাতের সম্ভাব্যতা যাচাই করছেন।
তিনি বলেন, "তারা আসলে এটি নির্ধারণ করার চেষ্টা করছেন না যে এই সফরটি সার্থক কি না। বরং তারা এটি বোঝার চেষ্টা করছেন যে, চীন এমন একটি জায়গা হতে পারে কি না — যেখানে তাদের সন্তানরা পড়াশোনা করতে পারবে, বসবাস করতে পারবে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে।"
