বাংলাদেশ স্থিতিশীল ও ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত—অংশীদারদের এই আস্থা ফেরানোই অগ্রাধিকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো দেশি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে এই পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা যে বাংলাদেশ এখন স্থিতিশীল এবং এখানে ব্যবসার পরিবেশ উন্মুক্ত।
শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে 'রোড ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি ২০২৬: নেভিগেটিং রিস্কস, লেভারেজিং রেজিলিয়েন্স' শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান বলেন, "ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে সরকার গভীর কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আমরা বিদ্যমান অসংখ্য প্রাতিষ্ঠানিক বাধা বা 'সিস্টেমিক বোটলনেক' দূর করে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাত থেকে শুরু করে বড় শিল্প গ্রুপ—সবার জন্য স্বচ্ছতা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। আমরা নতুন বাজার উন্মুক্ত করতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আমরা সব পক্ষ থেকে অভাবনীয় ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি।"
তিনি আরও যোগ করেন, "চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সুযোগ তৈরি হয়। রাজনৈতিক রূপান্তর অনেক প্রশ্নের জন্ম দিলেও এটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় লক্ষ্যকেও স্পষ্ট করে। আমাদের সরকারের সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতা রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচাইতে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলব।"
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বাধার মুখে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাকে নতুনভাবে সাজানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, "আমাদের বড় বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিবাচক হলেও তা ধীরগতির। এটি রপ্তানি চাহিদাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই আমাদের রপ্তানি অবস্থান ধরে রাখতে আরও তীব্র প্রতিযোগিতার প্রয়োজন হবে।"
বৈশ্বিক ঋণের বোঝা ও সুদ নিয়ে ড. খলিলুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উন্নত দেশগুলো যেখানে ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পায়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সেখানে ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদ গুনতে হয়। এছাড়া জলবায়ু ঝুঁকির কারণে এ ধরনের দেশগুলোকে প্রতি বছর অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সুদ দিতে হচ্ছে।
বর্তমান জ্বালানি সংকট সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে, যা দেশের আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি এবং ব্লকচেইনের মতো 'ট্রেড টেক' বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বড় পরিবর্তন আনছে, সেটিও তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর একটি স্পষ্ট রূপকল্প রয়েছে যা তিনটি প্রধান লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে: 'স্থিতিশীলতা, সংস্কার এবং উন্নয়ন'।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। বিদেশের দূতাবাস এবং হাইকমিশনগুলোকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সক্রিয় সহায়তাকারী হিসেবে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সরকারের 'প্রাথমিক কৌশলগত অংশীদার' হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ব্যবসায়িক জটিলতা দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতিক এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমাদের কাজের মাধ্যমে আমাদের বিচার করুন। আমাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির জন্য আমাদের দায়বদ্ধ রাখুন এবং বাংলাদেশের প্রাণবন্ত সম্ভাবনা উন্মোচনে আমাদের সাথে পথ চলুন।"
