১৫০ বছর আগে ধার নেওয়া বই অবশেষে লাইব্রেরিতে ফেরত; জরিমানা মওকুফ
অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় এক লাইব্রেরি থেকে ১৫০ বছর আগে ধার নেওয়া একটি বই ফেরত দিয়েছেন ৭৭ বছর বয়সী রস সিমন্স । বইটি ধার নিয়েছিলেন তার প্রপিতামহ।
১৮৭০ এর মাঝামাঝি সময়ে সিডনি থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত উপকূলীয় শহর কিয়ামার স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে 'অ্যান্টিকুইটিজ অব অ্যাথেন্স' বইটি ধার নেওয়া হয়।
গ্রিক স্থাপত্যের ওপর লেখা বইটি কয়েক দশক ধরে কাঠের বোর্ড দিয়ে বন্ধ একটি ফায়ারপ্লেসের পেছনে চায়ের কাঠের বাক্সে লুকানো ছিলো।
রস সিমন্সের ধারণা, তার প্রপিতামহ জন সিমন্স হয়তো নিজের কাজের জন্য বইটি ধার নিয়েছিলেন। জন সিমন্স ১৮০০-এর মাঝামাঝি সময়ে ওয়েস্টমিনস্টারে একজন শিক্ষানবিস রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় স্থপতি হিসেবে কাজ শুরু করেন।
নিজেকে পারিবারিক ইতিহাসের প্রতি অনুরাগী দাবি করা সিমন্স জানান, তার প্রপিতামহ ১৮৩৯ থেকে ১৮৪৪ সালের মধ্যে লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন।
সিমন্স বলেন, লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে তিনি পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণের কাজে অন্যান্য রাজমিস্ত্রিদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৮৫৭ সালে, ২৭ বছর বয়সে জন সিমন্স যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। প্রথমে তিনি সিডনির নিউটাউনে বাস করতেন। পরবর্তীতে একটি বেলেপাথরের গির্জা নির্মাণের দায়িত্বে থাকার পর তিনি কিয়ামায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সিমন্স বলেন, স্থাপত্য, নির্মাণকাজের প্রতি তার প্রপিতামহের বেশ আগ্রহ ছিল। তিনি আরও বলেন, বইটি সম্ভবত তার বাড়ির তাকের ওপর রাখা থাকত এবং এটি তিনি রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহার করতেন।
বইটি কোনোভাবে অন্যান্য পারিবারিক নথিপত্রের সাথে একটি চায়ের বাক্সে গিয়ে পড়ে যেটিকে একটি বন্ধ ফায়ারপ্লেসের ভেতরে রাখা হয়েছিল।
প্রায় ৩০ বছর আগে সংস্কারকাজের সময় চায়ের সেই কাঠের বাক্সটি উদ্ধার করা হয় এবং এ বইটিসহ বাকি বইগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিমন্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি প্রথমবারের মতো বইগুলোর ভেতরে খুঁটিয়ে দেখা শুরু করেন।
সিমন্স বলেন, 'আমি প্রচ্ছদের ভেতরের পাতাটি খুলতেই অবাক হয়ে যাই , দ্বিতীয় পাতায় কিয়ামা লাইব্রেরির একটি সিল দেখতে পেলাম।' বইয়ের প্রচ্ছদের ভেতরের অংশে লাইব্রেরি থেকে বই ধার নেওয়ার নিয়মাবলীও বিস্তারিত লেখা ছিল।
সেখানে লেখা ছিলো, লাইব্রেরির সদস্যরা একবারে কেবল একটি বই-ই ধার নিতে পারতেন। তবে যদি প্রমাণ করা যেত যে একই পরিবারের অন্তত ছয়জন লোক পড়তে পারেন, সে ক্ষেত্রে তিনটি পর্যন্ত বই ধার দেওয়া হতো।
মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত যেকোনো ব্যক্তির বই ধার নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের পর বই ফেরত দিলে প্রতি বিলম্বিত সপ্তাহের জন্য তিন পেন্স করে জরিমানা গুণতে হতো।
কিয়ামা লাইব্রেরির কর্মীরা হিসাব করে দেখেছেন যে, মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় এই জরিমানার পরিমাণ দাঁড়াত ৯৭ পাউন্ড—অথবা বর্তমান মুদ্রায় প্রায় ২৮,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। তবে সিমন্স পরিবারের জন্য এ জরিমানা মওকুফ করা হয়েছে।
কিয়ামা কাউন্সিলের লাইব্রেরি ম্যানেজার মিশেল হাডসন জানান, এ ঘটনাটি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, 'মানুষ কেবল এ বইটি ছুঁয়ে দেখতে ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ছুটে এসেছে।'
হাডসন জানান, কাপড়ে বাঁধা এ বইটিতে পানি লেগে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বইটির অবস্থা বেশ ভালো।
তিনি বলেন, 'বইটিতে অপূর্ব কিছু চিত্রাঙ্কন রয়েছে এবং এমন কিছু ভাঁজ করা পাতা আছে যা খুললে দেখা যায়, গ্রিসের কিছু স্মৃতিস্তম্ভের একদম নিখুঁত পরিমাপ ব্যবহার করে চিত্রগুলো আঁকা হয়েছিল।'
তিনি আরও জানান, ১৮৭২ সালে শহরটিতে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য কাউন্সিল ২০০ পাউন্ডের একটি অনুদান পেয়েছিল এবং তখন এর সংগ্রহে ১,০০০টিরও কম বই ছিল যার মধ্যে এই বইটি ৫০৬ নম্বর হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল।
হাডসন জানান, বইটি কে, কখন ধার নিয়েছিলেন তা জানার আর কোনো উপায় নেই, কারণ সে সময়ের লাইব্রেরির লেনদেন বা ধারের রেকর্ডগুলো ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে।
তবে বইটি আর জনসাধারণের ধার নেওয়ার সুযোগ থাকছে না। এটিকে লাইব্রেরির বিশেষ জিনিসপত্রের সংগ্রহে যোগ করা হয়েছে, যা অনুরোধ সাপেক্ষে দেখা যাবে।
হাডসন রসিকতা করে বলেন, 'বইটি আর বাইরে যেতে দেওয়া হবে না... এটি ফেরত পাওয়ার জন্য আমরা আর ১৫০ বছর অপেক্ষা করতে চাই না।'
সিমন্স বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে তার প্রপিতামহ বইটি ফেরত দেওয়া হয়েছে দেখলে খুশিই হতেন।
