ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর গোপন ‘প্রেমিকা’র বিপুল খরচের জোগান দিয়েছে উয়েফা, পছন্দের পাত্রীকে দিয়েছেন পদোন্নতি ও বেশি বেতন
উয়েফার সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন নিজের এক কথিত প্রেমিকাকে সংস্থাটির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফায় শীর্ষ পদে থাকাকালীন এক নারী কর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ইনফান্তিনো। ওই সম্পর্ক চলাকালীন সেই নারীকে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং তিনি যখন উয়েফা ত্যাগ করেন, তখন তাকে ছয় অঙ্কের (লাখ লাখ পাউন্ড) অর্থ দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ওই নারীর উচ্চতর শিক্ষার (এমবিএ) যাবতীয় খরচও বহন করেছিল উয়েফা।
শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে উয়েফা স্বীকার করেছে যে, ওই নারীকে অর্থ প্রদান করা হয়েছিল এবং তার সঙ্গে ইনফান্তিনোর সম্পর্কের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তারা অবগত ছিল। সংস্থাটি জানায়, এরপর থেকে তারা তাদের নিয়মনীতি আরও 'কঠোর' করেছে, যাতে একটি আধুনিক ও উচ্চপর্যায়ের সংস্থায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
দ্য টেলিগ্রাফের এই অনুসন্ধান এমন এক সময়ে এল যখন ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর ভূমিকা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ২০০০ সালে উয়েফায় যোগ দেওয়া ইনফান্তিনো ২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি হওয়ার আগে দীর্ঘ ১৬ বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন।
চার সন্তানের জনক ও বিবাহিত ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি উয়েফার সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন এক জুনিয়র নারী কর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। সহকর্মী ও উয়েফার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ইনফান্তিনো নিশ্চিত করেছিলেন যেন ওই নারী অন্তত ছয় অঙ্কের অর্থ নিয়ে সংস্থাটি ছাড়তে পারেন।
সূত্রের দাবি, সম্পর্ক চলাকালীন ওই নারীকে প্রশাসনিক পদ থেকে সরিয়ে লাভজনক ও উচ্চপদস্থ ম্যানেজারিয়াল পদে উন্নীত করা হয়। উয়েফা ছাড়ার পর ইনফান্তিনো নিজের প্রভাব খাটিয়ে ওই নারীর জন্য অন্য এক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনের চাকরির ব্যবস্থাও করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পক্ষ থেকে এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। ফিফার একজন মুখপাত্র বলেন, 'ফিফা সভাপতি এই অভিযোগগুলোকে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করছেন এবং এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। যেকোনো ধরনের অশোভন আচরণ বা নিয়ম লঙ্ঘনের ইঙ্গিত মানহানিকর। ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে উয়েফা বা ফিফায় কোনো কর্মী কখনও অভিযোগ করেননি। বিচ্ছেদকালীন অর্থ প্রদানের বিষয়টি তৎকালীন নিয়ম মেনেই যথাযথ পরিচালকদের দ্বারা অনুমোদিত ছিল।'
প্লাতিনির আল্টিমেটাম: 'সে থাকবে নাকি তুমি?'
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তৎকালীন উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনি যখন এই সম্পর্কের কথা জানতে পারেন, তখন তিনি ইনফান্তিনোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন। সূত্রের মতে, প্লাতিনি অনেকটা হুমকির সুরে বলেছিলেন, 'সে চলে যাবে, নাকি তুমি?'
শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনো জানান যে ওই নারীই পদত্যাগ করবেন। এরপরই মোটা অঙ্কের অর্থ ও বিজনেস স্কুলে এমবিএ করার শর্তে (যার বার্ষিক ফি প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড) ওই নারী উয়েফা ছাড়েন।
উয়েফা তাদের ওয়েবসাইটে দাবি করে থাকে যে, তাদের আয়ের ৯৭.৫ শতাংশ অর্থ ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, ওই নারীর পেছনে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা তৃণমূল ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় হতে পারত। অভিযোগ অনুযায়ী, ইনফান্তিনো ওই নারীর বেতন ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করে বার্ষিক ১ লাখ ৬০ হাজার সুইস ফ্রাঁ (প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার পাউন্ড) নির্ধারণ করেছিলেন।
৫৩টি দেশের ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উয়েফার প্রধান থাকাকালীন ইনফান্তিনো প্রায় ১২০ কোটি পাউন্ডের সাম্রাজ্য দেখাশোনা করতেন। ২০০১ সালে তিনি লিনা আল আশকারকে বিয়ে করেন। লিনা লেবানন ফুটবল ফেডারেশনে কর্মরত ছিলেন। তাদের চার কন্যা সন্তান রয়েছে। তবে এই সম্পর্কের বিষয়ে লিনা অবগত ছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
টেলিগ্রাফের এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এল যখন ফিফার বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে ইনফান্তিনোর একটি বড় পরিকল্পনা উয়েফার আপত্তির মুখে ভেস্তে গেছে। উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ আগামী বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দিয়ে ওই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে।
এছাড়া কাতার বিশ্বকাপে টিকেটের মূল্য বৃদ্ধি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের তদবিরে যুক্তরাষ্ট্রের এক ফুটবলারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ইনফান্তিনো এমনিতেই চাপে রয়েছেন।
ফিফা সভাপতি হিসেবে পদত্যাগ করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন ইনফান্তিনো। তবে নতুন করে ওঠা এই নৈতিক স্খলনের অভিযোগ তার মসনদকে আরও নড়বড়ে করে দিতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তৎকালীন উয়েফা প্রধান মিশেল প্লাতিনি।
