স্পেনের বিশ্বকাপ উদ্যাপনের ছবি থেকে ট্রাম্পকে 'ক্রপ' করে বাদ দিয়েছে ফিফা
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে স্পেনের বিজয় উদ্যাপনের ছবি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্রপ করে (কেটে) বাদ দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
ট্রফি উন্মোচন মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও পরবর্তীতে ফিফা তাদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ট্রাম্পকে বাদ দিয়েই উদযাপনের ছবি পোস্ট করেছে।
গত রবিবার রাতে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারানোর পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্প স্পেনের খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানান। তিনি অধিনায়ক রদ্রির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফিও তুলে দেন।
ট্রফি গ্রহণের পর রদ্রি ট্রাম্প সরে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে সামনে থেকে সরে যেতে ইশারাও করছিলেন, যাতে সতীর্থদের সঙ্গে ট্রফি উঁচিয়ে উদ্যাপন করতে পারেন। তবে ট্রাম্প তখনও মঞ্চের সামনের অংশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
পরে ফিফার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বিজয় উদ্যাপনের ছবিতে ট্রাম্পকে ক্রপ করে বাদ দেওয়া হয়।
ফিফা বিশ্বকাপের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত আরেকটি ছবিতে স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকেও রাখা হয়নি। তবে স্পেন জাতীয় দলের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ছবিতে তিনি ছিলেন।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনও এমন একটি ছবি ব্যবহার করেছে, যাতে ট্রাম্প অনুপস্থিত । সেটি তোলা হয়েছিল ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর।
আর্জেন্টিনার আচরণ নিয়ে স্প্যানিশ গণমাধ্যমের সমালোচনা
ফাইনালের পর কূটনৈতিক নানা ঘটনার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার আচরণও স্প্যানিশ গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
স্পেনের কয়েকজন খেলোয়াড়, বিশেষ করে গোলরক্ষক উনাই সিমোনকে ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দনে অনাগ্রহী মনে হয়েছে। ট্রাম্প ট্রফি উন্মোচনের সময়ও মঞ্চের কেন্দ্রেই থাকতে চেয়েছিলেন।
অবশেষে ট্রাম্প অধিনায়ক রদ্রির পাশ থেকে সরে গিয়ে স্পেন দলের এক পাশে দাঁড়ান।
স্পেনের ক্যাডেনা এসইআর রেডিওর ফুটবল ভাষ্যকার দানি গারিদো বলেন, 'বাহ, রদ্রি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, যতক্ষণ না ট্রাম্প ছবি থেকে সরে যান।'
তিনি বলেন, 'রদ্রির ব্যক্তিত্বকে অভিনন্দন। এটা কোনো ছোট বিষয় নয়। অনেক সময় ছবিতে এমন মানুষকে দেখা যায়, যাদের সেখানে থাকার কথা নয়। ট্রাম্প স্পষ্টতই ছবিতে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি সরে যাওয়ার পরই রদ্রি বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।'
গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপেও ট্রাম্প ট্রফি উদ্যাপনের সময় চেলসির অধিনায়ক রিস জেমসের পাশে দাঁড়িয়ে ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
অন্যদিকে স্পেনের খেলোয়াড়রা রাজা ষষ্ঠ ফেলিপেকে ট্রফি নিয়ে উদ্যাপনে অংশ নিতে স্বাগত জানান। সোমবার বিকেলে মাদ্রিদে রাজা খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দেওয়ার কথা ছিল। এরপর তারা ছাদখোলা বাসে শহর প্রদক্ষিণ করেন।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কয়েকটি 'অশোভন আচরণ'ও স্প্যানিশ গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।
তাদের দাবি, স্পেনের খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনা দলের জন্য 'গার্ড অব অনার' তৈরি করেন এবং অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিসহ কয়েকজন খেলোয়াড়কে সান্ত্বনা জানান। তবে আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে একই ধরনের সৌজন্য দেখানো হয়নি।
স্প্যানিশ দৈনিক এল পাইস আর্জেন্টিনাকে 'হার মেনে নিতে না পারা দল' হিসেবে উল্লেখ করে।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন টিভিই ম্যাচ শেষে সংঘর্ষের স্লো মোশন ভিডিও সম্প্রচার করে। বিশেষ করে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে কয়েকজন স্প্যানিশ খেলোয়াড়ের ওপর হামলার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
টিভিইর পর্দায় লেখা ছিল, 'পারেদেসের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টাইন এই মিডফিল্ডার প্রথমে এরিক গার্সিয়া এবং পরে গাভির ওপর হামলা করেন।'
তবে বিতর্কের বাইরে থেকে বেশির ভাগ স্প্যানিশ প্রতিক্রিয়া ছিল বিশ্বকাপজয়ের উদ্যাপন ঘিরেই।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্সে লেখেন, 'আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন! আমাদের জাতীয় দল ছিল দুর্দান্ত।'
দৈনিক এল মুন্দো প্রথম পাতার শিরোনাম করে, 'বিশ্বের শীর্ষে!' আর এল পাইস শিরোনাম দেয়, 'চ্যাম্পিয়ন'।
তবে ক্যাডেনা এসইআরের ফুটবল বিশ্লেষক মানু কারেনিও ম্যাচের রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের সমালোচনা করেন। তিনি তাকে 'আর্জেন্টিনার ম্যাচসেরা খেলোয়াড়' বলে কটাক্ষ করেন।
কারেনিওর অভিযোগ, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কঠোর ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি ও নানা 'কৌশল' উপেক্ষা করার পাশাপাশি স্বাভাবিক সময়ে মিকেল মেরিনোর গোল হওয়ার মুহূর্তে নিকোলাস ওতামেন্দির ওপর ফাউলের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দিয়ে খেলা থামিয়ে দেন ভিনচিচ।
ফাইনালের আগে মাঠে 'সৌভাগ্যের মুদ্রা' পুঁতে রাখেন কুকুরেয়া
স্পেন ও রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়াকে ফাইনাল শুরুর আগে গোপনে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাঠে একটি 'সৌভাগ্যের' মুদ্রা পুঁতে রাখতে দেখা গেছে। ২০১০ সালে স্পেনের একমাত্র আগের বিশ্বকাপ জয়ের আগে সাবেক ডিফেন্ডার জোয়ান ক্যাপদেভিলা একই রীতি পালন করেছিলেন। কুকুরেয়াও সেই রীতিই অনুসরণ করেন।
ফাইনাল দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইএসটিএ ভিসার অনুমোদনে সহায়তা চাওয়া ক্যাপদেভিলাই এই ভিডিও ধারণ করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরেয়া মোজা থেকে একটি বস্তু বের করে কিক-অফের প্রস্তুতির সময় টাচলাইনের পাশে ঘাসের নিচে সেটি পুঁতে রাখছেন।
কুকুরেয়াকে মাঠের এক প্রান্তে হেঁটে যেতে, চারপাশে কেউ দেখছে কি না তা নিশ্চিত হতে পেছনে তাকাতে এবং পরে নিচু হয়ে মোজার ভেতর থেকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে রাখা মুদ্রাটি মাটিতে পুঁতে রাখতে দেখা যায়।
ক্যাপদেভিলা এক্সে লেখেন, '২০১০ সালে ম্যাচ শুরুর আগে আমিও মাঠের ঘাসে একটি মুদ্রা পুঁতে রেখেছিলাম। বিষয়টি আমি অসংখ্যবার বলেছি। গতকাল কুকুরেয়াকেও একই কাজ করতে বলেছিলাম।'
ফাইনালের আগে কুকুরেয়া বলেছিলেন, স্পেন বিশ্বকাপ জিতলে তিনি প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের মুখের ট্যাটু করানোর কথা ভাবছেন।
ট্যাটুর বিষয়ে জানতে চাইলে কুকুরেয়া বলেন, শরীরের কোথায় ট্যাটু করাবেন, তা এখনও ঠিক করেননি।
তিনি বলেন, 'এটা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। কোথায় করাব, সেটাও ভাবতে হবে। মানুষ নিশ্চয়ই আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবে। তাই এমন জায়গায় করতে হবে, যা দেখা যায়।'
তবে ট্যাটুটি 'বেশ ছোট' হবে বলেও জানান তিনি।
জয়সূচক গোলদাতা ফেরান তোরেস মাথার চুল ফেলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আর স্প্যানিশ তারকা ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল বলেছিলেন, তিনি দাড়ি বড় করার চেষ্টা করবেন।
স্পেনের ভূকম্পবিদরা জানিয়েছেন, রোববারের ফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তারা ভূকম্পনের মতো কম্পন রেকর্ড করেছেন। সারা দেশের সমর্থকেরা আনন্দে লাফিয়ে ওঠায় এই কম্পন সৃষ্টি হয়।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ইনস্টিটিউট (আইজিএন) ও কাতালোনিয়ার জিওলজিক্যাল অ্যান্ড কার্টোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের (আইসিজিসি) তথ্য বিশ্লেষণে আলহেসিরাস, আলকয়, কাদিজ, গ্রানাডা, এলদা, হুয়েলভা, গ্রানোলিয়ার্স, বার্সেলোনা ও লেইদাসহ বিভিন্ন স্থানে এই কম্পনের সংকেত পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ম্যাচ চলাকালে তিনটি বড় কম্পন রেকর্ড করা হয়। এগুলো ছিল ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল হওয়া একটি গোলের সময়, ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলের সময় এবং শেষ বাঁশি বাজার পর সবচেয়ে তীব্র উদ্যাপনের সময়।
