আবারও স্যামসাং ফোন উৎপাদন করবে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস
প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশে আবারও ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে স্যামসাং। আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্যামসাং স্মার্টফোন আবারও বাজারে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্যামসাংয়ের উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতে নতুন গতি আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে দেশে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন সংযোজনকারী প্রথম বৈশ্বিক স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ছিল স্যামসাং।
নরসিংদীর শিবপুরে প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় ইতোমধ্যে স্যামসাং ব্র্যান্ডের রেফ্রিজারেটর উৎপাদন শুরু হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে ওয়াশিং মেশিন উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন ও স্মার্টফোন উৎপাদনও শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত জিজুন কিম বুধবার (২২ জুলাই) নরসিংদীর শিবপুরে কারখানা পরিদর্শনে যান। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন— স্যামসাং বাংলাদেশ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাংমিন জাং এবং ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব।
ফেয়ার গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের আনুষ্ঠানিক পরিবেশক হয়। ২০১৭ সালে স্থানীয় উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে এবং ২০১৮ সালে দেশের প্রথম স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্যামসাং স্মার্টফোন বাজারে আনে।
ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতে ফেয়ার গ্রুপের মোট বিনিয়োগ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু স্মার্টফোন উৎপাদনেই বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। কারখানাটির বার্ষিক মোবাইল ফোন উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ লাখ ইউনিট।
স্যামসাংয়ের উৎপাদন পুনরায় শুরুর পাশাপাশি বর্তমানে ফেয়ার গ্রুপ চীনের হাইসেন্স ব্র্যান্ডের পণ্যও উৎপাদন করছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দুটি ব্র্যান্ড মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার হাইসেন্স রেফ্রিজারেটর উৎপাদন করছে।
কারখানা পরিদর্শনে দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইনে রেফ্রিজারেটর সংযোজন করা হচ্ছে। ধাতব বডি তৈরি, যন্ত্রাংশ সংযোজন, ফোম ইনসুলেশন, কম্প্রেসর স্থাপন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত মান পরীক্ষা—সব ধাপই সেখানে সম্পন্ন হচ্ছে।
ফেয়ার গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ২০২৩ সালে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পর ব্যবসার পরিবেশ কঠিন হয়ে ওঠায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে স্যামসাং স্মার্টফোন উৎপাদন বন্ধ ছিল।
তিনি বলেন, 'সে সময় কার্যত ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।'
তিনি জানিয়েছেন, ফেয়ার গ্রুপ ২০২৫ সালে তাদের কার্যক্রম নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। এ বছর পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আবার উৎপাদন শুরু করেছে।
মেসবাহ বলেন, বাজারে ৪জি থেকে ৫জি ডিভাইসে রূপান্তরের কারণে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের প্রয়োজন হয়েছে। এ কারণেও স্মার্টফোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
তিনি বলেন, কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ লাখ হ্যান্ডসেট হলেও উৎপাদন পুনরায় শুরুর পর প্রথম বছরে পুরো সক্ষমতা ব্যবহারের আশা করছে না প্রতিষ্ঠানটি।
কারখানা পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত কিম ফেয়ার ইলেকট্রনিকসকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উৎপাদন এবং শিল্প সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ ও পরিশ্রমী কর্মশক্তি, কোরিয়ার প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সঙ্গে মিলে দেশটিকে কোরীয় কোম্পানিগুলোর জন্য একটি আঞ্চলিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব সরকারকে গ্রে মার্কেট ও অনানুষ্ঠানিকভাবে মোবাইল ফোন আমদানির বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সহায়ক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় উৎপাদন ত্বরান্বিত হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
স্যামসাং বাংলাদেশ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাংমিন জাং বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি স্যামসাংয়ের বৈশ্বিক মান বজায় রেখে ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিশ্রুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
