এআই চিপের চাহিদায় স্যামসাংয়ের মুনাফা বাড়ল ১৮০০ শতাংশ
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মেমোরি চিপের বিপুল চাহিদার ওপর ভর করে নিজেদের পরিচালন মুনাফা রেকর্ড ১৯ গুণ বাড়ার প্রত্যাশা করছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স।
প্রতিষ্ঠানটির খসড়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শুরু থেকে জুনের শেষ নাগাদ তাদের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন উন (৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এর মাধ্যমে টানা তৃতীয় প্রান্তিকে (কোয়ার্টার) রেকর্ড পরিচালন মুনাফা অর্জন করতে যাচ্ছে প্রযুক্তি জায়ান্টটি।
বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে স্যামসাংয়ের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই আয়ের এই খসড়া পূর্বাভাস প্রকাশ করে থাকে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত স্যামসাংয়ের এই সর্বশেষ পূর্বাভাসটি এমন এক সময়ে এল যখন বৈশ্বিক বাজারে সেমিকন্ডাক্টরের (চিপ) চাহিদা সরবরাহের চেয়ে অনেক বেশি। আর এই চাহিদাই মূলত বাজারে চিপের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি জুলাই মাসের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
স্যামসাং তাদের আয়ের খসড়া পূর্বাভাস বা 'আর্নিংস গাইডেন্স'-এ জানিয়েছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তাদের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭১ ট্রিলিয়ন উন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের শিল্প বিশ্লেষক মার্ক আইনস্টাইন বলেন, স্যামসাংয়ের এই সম্ভাব্য আয় তাদের ইতিহাসের 'অন্যতম সেরা প্রান্তিক পারফরম্যান্স'। এটি চলতি বছরের শুরুতে চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এনভিডিয়ার গড়া প্রযুক্তি খাতের রেকর্ডের খুবই কাছাকাছি।
তিনি আরও যোগ করেন, 'এর সব কৃতিত্বই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের জোয়ারের। চিপের সীমিত সরবরাহ এবং অভূতপূর্ব চাহিদার ওপর ভর করে চিপ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো এখন সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছে।'
বাজারে সরবরাহ ঘাটতি থাকায় স্যামসাং ইতোমধ্যে তাদের মেমোরি চিপের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসি জানিয়েছে, ডাটা সেন্টার এবং অন্যান্য এআই অবকাঠামোর জন্য সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা মেমোরি চিপ শিল্পের ইতিহাসে 'যেকোনো সময়ের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন'। আর এটি আমাদের দৈনন্দিন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের জন্য চিপ সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
আইডিসির প্রযুক্তি ডিভাইস গবেষক ব্রায়ান মা বলেন, 'এআই ডাটা সেন্টারগুলোর চড়া চাহিদার কারণে আমরা আশা করছি আগামী বছর পর্যন্ত বাজারে চিপের এই সরবরাহ সংকট বজায় থাকবে।'
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্যামসাং নিজস্ব ইলেকট্রনিক্স পণ্য তৈরির পাশাপাশি এনভিডিয়া ও গুগলের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর জন্যও চিপ তৈরি করে থাকে। চিপের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মুনাফা বৃদ্ধির সুসংবাদের পরও গত মঙ্গলবার সকালে সিউল শেয়ারবাজারে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দর ৮ শতাংশের বেশি কমে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু বিনিয়োগকারী স্যামসাংয়ের আয়ের পরিমাণ আরও বেশি হবে বলে আশা করেছিলেন।
তবে চলতি বছরের শুরু থেকে বাজারমূল্যে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে তাদের দক্ষিণ কোরিয়ান প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্স-এর শেয়ারের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশের বেশি।
এই দুই কোম্পানির শক্তিশালী পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে দক্ষিণ কোরিয়ার বেঞ্চমার্ক শেয়ার সূচক 'কোসপি'-র মান চলতি বছর ৮০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগে মে মাসে এনভিডিয়া রেকর্ড ত্রৈমাসিক বিক্রি ও মুনাফার হিসাব প্রকাশ করে, যেখানে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে তাদের রাজস্ব ৮০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চিপ খাতে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণে সে সময় এনভিডিয়ার শেয়ারের দর কিছুটা কমেছিল।
চিপের বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে গত জুনে দক্ষিণ কোরিয়া একটি মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী বছরগুলোতে দেশটির চিপ উৎপাদন আরও বাড়াতে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের নেতৃত্বে অন্তত ৮৮০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশ্ববাজারে চিপের চড়া চাহিদা মেটাতে জাপান, চীন এবং তাইওয়ানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী এশীয় দেশগুলোও চিপ তৈরির কারখানায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে।
