মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে চীনের চিপ সরঞ্জাম পরীক্ষা করছে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স
দক্ষিণ কোরিয়ার দুই বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্স চীনের তৈরি চিপ উৎপাদন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করে দেখছে। এর মূল কারণ হলো—ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র চীনে চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানির ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
তিনটি সূত্র জানিয়েছে, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স চীনের সাংহাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্সড মাইক্রো-ফ্যাব্রিকেশন ইকুইপমেন্ট (এএমইসি)-এর তৈরি চিপ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র পরীক্ষা করছে। এই যন্ত্রকে এচিং মেশিন বলা হয়, যা চিপ তৈরির সময় সিলিকন ওয়েফারের ওপর থেকে নির্দিষ্ট অংশ সরিয়ে চিপের সূক্ষ্ম নকশা তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
প্রায় দুই বছর আগে তারা এই যন্ত্র পরীক্ষা শুরু করে। তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনে থাকা বিদেশি চিপ নির্মাতাদের মার্কিন তৈরি চিপ সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুমতি ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
তবে এখনো পর্যন্ত এএমইসির যন্ত্র বড় পরিসরে ব্যবহারের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্স। তারপরও বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতাদের কাছ থেকে পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া এএমইসির জন্য বড় ধরনের স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নীতির একটি বড় বৈপরীত্যও তুলে ধরছে। ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ছিল চীনের চিপ শিল্পের উন্নতি ধীর করা। কিন্তু এর ফলে উল্টো চীনের নিজস্ব চিপ সরঞ্জাম নির্মাতারা বিদেশি কোম্পানির কারখানায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
স্যামসাং জানিয়েছে, তারা চীনের কারখানায় ব্যবহারের জন্য এএমইসির কোনো সরঞ্জাম পরীক্ষা করেনি এবং এমন পরিকল্পনাও নেই।
এসকে হাইনিক্স এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এএমইসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দেখভালকারী সংস্থা ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ছে
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের চীনা কারখানাগুলোকে বিশেষ অনুমোদন দেয়। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন চিপ সরঞ্জাম চীনে নেওয়ার জন্য প্রতিবার আলাদা অনুমতি নিতে হতো না।
কিন্তু ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই বিশেষ সুবিধা বাতিল করে দেয়। পরে ২০২৬ সালের জন্য এসব কোম্পানিকে চীনে থাকা কারখানার জন্য চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি আনার অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে কোম্পানি দুটি এখনো আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র শুধু নতুন যন্ত্রপাতি নয়, চীনের কারখানায় আগে থেকেই থাকা মার্কিন যন্ত্রের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ বা যন্ত্রাংশ সরবরাহের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।
এই কারণে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স চীনা সরবরাহকারীদের বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত রাখছে। তবে তারা চীনে নতুন করে বড় বিনিয়োগ বা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নয়, বরং বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখা ও উন্নত করার জন্য এসব বিকল্প তৈরি করছে।
স্যামসাং চীনের শিয়ান শহরে ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি চিপ তৈরি করে।
এসকে হাইনিক্স চীনের দালিয়ানে ন্যান্ড মেমোরি চিপ এবং উশিতে ডিআরএএম মেমোরি চিপ তৈরি করে।
এসব কারখানায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস এবং ল্যাম রিসার্চ-এর তৈরি এচিং যন্ত্রের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে।
চীনা চিপ সরঞ্জাম শিল্পের জন্য বড় সুযোগ
স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের মতো বিশ্বের বড় চিপ নির্মাতারা যদি এএমইসির যন্ত্র ব্যবহার শুরু করে, তাহলে তা চীনের চিপ সরঞ্জাম শিল্পের জন্য বড় ধরনের স্বীকৃতি হবে।
চীনা চিপ সরঞ্জাম নির্মাতারা এখনো উন্নত চিপ তৈরির কিছু প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের কোম্পানির তুলনায় পিছিয়ে আছে। তবে এচিং, চিপের স্তর তৈরি, পরিষ্কার করা এবং পৃষ্ঠ মসৃণ করার মতো প্রযুক্তিতে তারা দ্রুত উন্নতি করেছে।
এছাড়া চীনা সরঞ্জামের দাম অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকইনসাইটসের কর্মকর্তা ড্যান হাচেসনের মতে, চীনা সরঞ্জামের দাম একই ধরনের বিদেশি যন্ত্রের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম হতে পারে।
চীনের বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিস ইতোমধ্যে এএমইসির তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করছে। এ কারণে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স মনে করছে, এএমইসির কিছু যন্ত্র পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট উন্নত হয়েছে।
চীনা সরঞ্জাম নির্মাতাদের অগ্রগতি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস, ল্যাম রিসার্চ, কেএলএ এবং জাপানি ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে চীন এখনো এসব বিদেশি কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার। উদাহরণ হিসেবে, অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস ২০২৫ অর্থবছরে চীন থেকে ৮ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ।
চীনা কোম্পানির সামনে সম্ভাবনা ও বাধা
চীনের চিপ সরঞ্জাম শিল্প এগিয়ে গেলেও তাদের সামনে এখনো অনেক বাধা রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষামূলক অনুমোদন প্রক্রিয়া, সীমিত সেবা নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তি চুরির আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো নিজেদের দেশের কারখানায় চীনা যন্ত্র ব্যবহার করবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত। কারণ সেখানে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ চীনের চিপ সরঞ্জাম শিল্পকে বড় ধরনের সুযোগ দিয়েছে।
ডয়চে ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চীনের নাউরা টেকনোলজি, এএমইসি, পাইওটেক এবং এসিএম রিসার্চ—এই চারটি প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালে প্রত্যেকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করতে পারে।
ব্যাংকটির ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠান মিলে চলতি বছর চীনের প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের চিপ তৈরির সরঞ্জাম বাজারের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
আর উন্নত আলো-ভিত্তিক চিপ তৈরির যন্ত্র ও পরিমাপ প্রযুক্তির বাজার বাদ দিলে চীনা কোম্পানিগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
