মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে চীনের বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি: গবেষণা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠতে চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো উন্মুক্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নিজস্ব উদ্ভাবনের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে। একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় (এনটিটি লিস্ট) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর—চীনা কোম্পানিগুলোর প্যাটেন্ট আবেদনে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ উদ্ধৃতির (সাইটেশন) হার ৭২ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল তাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা ধরে রাখতে তারা এনটিটি লিস্টের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। তবে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিগত ১২ বছরের চীনা প্যাটেন্ট আবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, মার্কিন প্রযুক্তিতে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়— চীনা কোম্পানিগুলো উল্টো উন্মুক্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যবহার এবং নিজস্ব গবেষণা জোরদার করেছে।
গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নাল 'সায়েন্স'-এ প্রকাশিত নীতিবিষয়ক নিবন্ধে গবেষকরা লিখেছেন, "আমাদের বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে যে এনটিটি লিস্টের মতো মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাগুলো এমন পরিণতি ডেকে এনেছে, যা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা পুরোপুরি ভাবতেও পারেননি।"
তারা আরও লেখেন, "স্বল্প মেয়াদে এসব নিষেধাজ্ঞা লক্ষ্যবস্তু বানানো কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা এসব কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত রূপান্তরে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে একটি পৃথক প্রযুক্তি ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যা বিদ্যমান বৈশ্বিক উদ্ভাবন ব্যবস্থার সাথে একীভূত না হয়ে বরং তার সাথে প্রতিযোগিতা করবে।"
চীনা প্রযুক্তি খাতে বিজ্ঞানভিত্তিক কাজের সংখ্যা এবং বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পটভূমিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে চীনা কোম্পানিগুলোর এই কৌশলগত রূপান্তর ঘটছে।
গবেষণাপত্রের লেখকরা জানান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তালিকাভুক্তির ফলে আমেরিকার স্বত্বাধিকারযুক্ত (প্রোপরাইটারি) প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধা আসলেও, চীনা কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সংগ্রহ থামায়নি। নিষেধাজ্ঞার পর লক্ষ্যবস্তু হওয়া কোম্পানিগুলো তাদের প্যাটেন্টে গড়ে প্রায় ০.৯৯টি দেশীয়, ০.২৭টি অ-মার্কিন বিদেশী এবং ০.২টি মার্কিন বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ উদ্ধৃত করেছে।
বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কর্পোরেট কৌশল বদলে দেয়—তা খতিয়ে দেখতে চীনের শেনজেন বিশ্ববিদ্যালয়, সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনা কোম্পানিগুলোর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্যাটেন্ট তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।
তারা দেখেছেন, চীনা কোম্পানিগুলো বিজ্ঞানের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা বহুলাংশে বাড়িয়েছে—একদিকে তারা প্যাটেন্টে বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের ব্যবহার বাড়িয়েছে, অন্যদিকে নিজেরাও বিপুল একাডেমিক নিবন্ধ তৈরি করছে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপের সহযোগী পরিচালক ও গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ওয়াং ইয়ানবো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিধিনিষেধ না চাইতেও– চীনে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতাকে ত্বরান্বিত করছে।
"একবার মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, তাদেরকে নিজ উদ্যোগেই প্রযুক্তিগুলো নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়," ওয়াং বলেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি প্রতিটি প্রযুক্তির পেছনে নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক নীতি থাকে। সেই বৈজ্ঞানিক নীতিগুলো বোঝার সর্বোত্তম উপায় হলো একাডেমিক নিবন্ধগুলো পড়া। এ কারণেই এসব চীনা কোম্পানি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ অনুসন্ধান করতে, উদ্ভাবনে সেই জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করতে এমনকি নিজেদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তৈরি করতে ব্যাপক অনুপ্রেরণা পাচ্ছে।
ওয়াং আরও বলেন, "আমেরিকা মূলত যা করছে তা হলো চীনকে স্বাধীন হতে এবং একটি পৃথক প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধ্য করছে।"
গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাটেন্ট ও ট্রেডমার্ক অফিস (ইউএসপিটিও) থেকে প্রাপ্ত প্যাটেন্টের বিচারে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় চীনা কোম্পানিগুলোর বৈজ্ঞানিক গবেষণা-সংশ্লিষ্ট প্যাটেন্ট ১৩.৪ গুণ বেড়েছে। যেখানে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল ১.৩ গুণ। তবে বৈজ্ঞানিক কাঠামোর গভীরতা ও ব্যাপ্তিতে চীনা কোম্পানিগুলো এখনও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
