স্বাস্থ্য বাজেট জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, ৪ প্রধান সমস্যা সমাধানই লক্ষ্য: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও পরিকল্পনা নিয়ে এবারের বাজেটকে "জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন" বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও তৃণমূলের চাহিদার ভিত্তিতেই এবারের স্বাস্থ্য বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বাজেট বাস্তবায়ন ও সেবা পেতে মানুষের ভোগান্তি দূর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রবিবার (১৪ জুন) বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে 'অর্থবছর ২০২৬-২০২৭: স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর নাগরিক সমাজের ভাবনা' শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ এবং আর্ক ফাউন্ডেশন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র তিন মাসেই তারা স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো সরাসরি মানুষের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, "প্রতিটি মানুষ বলেছে, হাসপাতালে যে সেবার আশায় যায়, তারা সেটা পায় না। তারা হাসপাতালে ঢুকতে দালাল বা বিভিন্ন কোম্পানির লোকদের খপ্পরে পড়ে যায়। আরেকটি নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে—আউটসোর্সিং। কে যে হাসপাতালের স্টাফ বা কে যে আউটসোর্সিং স্টাফ, সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আমাদের পক্ষেও বোঝা মুশকিল। হাসপাতালে প্রবেশ করার পর থেকেই মানুষের হেনস্থা শুরু হয়।"
তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরে ডা. মুহিত বলেন, "আপনি যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাবেন, দেখবেন চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা ক্লিনার—অর্ধেক মানুষ নাই। ১০ জন থাকার কথা থাকলে পাবেন ৫ জন। ২০ জন থাকার কথা থাকলে পাবেন ১০ জন। সাধারণ মানুষ এটা দেখে আর বলে, এখানে তো কিছু নাই, গেলে সেবা পাওয়া যায় না। এই অবস্থা থেকে আমরা উত্তরণ চাই।"
মানুষের প্রত্যাশা তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, "মানুষ আশা করে ডাক্তার পাঁচটি ওষুধ দিলে অন্তত দুটি যেন বিনামূল্যে পায়, কিন্তু সেই ওষুধটা পাওয়া যায় না। একইভাবে চারটি পরীক্ষার মধ্যে অন্তত দুটি পরীক্ষা বিনামূল্যে পেতে চায় সাধারণ মানুষ।"
তিনি আরও বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চারটি বিষয় উঠে এসেছে—হাসপাতালে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবলের অভাব, বিনামূল্যে ওষুধ না পাওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার চাপ। ডা. মুহিত বলেন, "আমাদের 'থিউরি অব চেঞ্জ' হওয়া উচিত এই চারটি সমস্যার সমাধান করা, যাতে পাঁচ বছর পর এসব সমস্যা আর না থাকে। একজন রোগী যেন নির্বিঘ্নে হাসপাতালে ঢুকতে পারেন, হয়রানির শিকার না হন, চিকিৎসক পান এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা সুবিধা পান—এটাই সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্য বাজেটের প্রকৃত অর্থ।"
প্রতিমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেট কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং গত আড়াই বছরের পরিকল্পনা, গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এটি তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রাইমারি হেলথকেয়ার জোরদার করা, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু এবং ফার্মেসি ডিসপেন্সারি সেবা সম্প্রসারণের প্রতিফলন এবারের বাজেটে রয়েছে।
তবে বাজেট বাস্তবায়নকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, "প্রতিবছর ২০-৩০ শতাংশ বাজেট ফেরত চলে যায়। এখন আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, না হলে বড় বরাদ্দ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।"
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনদের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার জরুরি বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি কেন্দ্রীয়করণ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিগত তিন মাসের তৎপরতা তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমরা হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেছি এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা সমাধানে দেশের ৩০০ জন সংসদ সদস্যকে (এমপি) চিঠি দিয়ে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা কাজ শুরু করেছেন। এমপিদের সম্পৃক্ততায় স্থানীয় অবকাঠামো ও সেবার মান বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।"
পরিশেষে ডা. এম এ মুহিত বলেন, "বাজেট নিয়ে আমরা মোটামুটি ঐকমত্যে পৌঁছেছি। এখন মূল কাজ হলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক অঙ্গীকার আছে, এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।"
