পুরুষ ছাড়াই যেভাবে ১ লাখ বছর ধরে টিকে আছে এই মাছ
কোনো প্রজাতির শুধু স্ত্রী সদস্যদের বিবর্তনের ধারায় একপ্রকার অচল গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে একটি প্রজাতি বিস্ময়করভাবে পুরুষ ছাড়াই ১ লাখ বছর ধরে টিকে আছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে, প্রকৃতি কীভাবে জীবের জিনগত ভাণ্ডারকে সুস্থ রাখে সে সম্পর্কে নতুন তথ্য মানুষের সামনে উঠে এসেছে।
মেক্সিকো এবং দক্ষিণ টেক্সাসের নদীগুলোতে এমন কিছু মাছ আছে যাদের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এ প্রজাতিটি উষ্ণ ও ধীরগতির পানিতে শুধু স্ত্রী সদস্য নিয়ে গঠিত দলে ভেসে বেড়ায়। তাদের রূপালি আঁশ ঘেঁষে যায় সম-প্রজাতির পুরুষ মাছ, আর সেখানেই সে সঙ্গী নির্বাচন করে।
কিন্তু বিবর্তনের এক অদ্ভুত মোড়ে, সেই পুরুষের জিন তার সন্তানদের মধ্যে কোনো ভূমিকা পালন করে না।
এটি 'গাইনোজেনেসিস' নামে পরিচিত একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে স্ত্রী মাছটি ডিমের বিকাশ ঘটানোর জন্য শুধু পুরুষের শুক্রাণু ব্যবহার করে, কিন্তু দ্রুতই তার বংশগত উপাদান বাতিল করে দেয়।
তারা শুধু কন্যাসন্তান জন্ম দেয়। এই মাছটির নাম অ্যামাজন মলি।
গ্রিক পুরাণের শুধু নারীদের নিয়ে গঠিত যোদ্ধা গোষ্ঠীর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এটি বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে আসছে।
বিবর্তন তত্ত্ব বলছে, অযৌন প্রজননকারী প্রজাতিগুলোর দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা, কারণ যৌন প্রজনন না থাকলে সময়ের সঙ্গে তাদের জিনগত ভাণ্ডারে ক্ষতিকর পরিবর্তন জমতে থাকে।
কিন্তু শুধু স্ত্রী সদস্য নিয়ে গঠিত এই প্রজাতি প্রায় ১ লাখ বছর ধরে টিকে আছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, জীবন বৃক্ষের ইতিহাসে এটি ক্ষণস্থায়ী একটি উপস্থিতি হওয়ার কথা ছিল।
তবুও এই ছোট ও সাধারণ দেখতে প্রাণীটি টিকে রয়েছে। বিবর্তন তত্ত্ব যেখানে বলছে অ্যামাজন মলির অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে এটি কীভাবে টিকে রইল?
নতুন গবেষণা এই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করতে শুরু করায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পাচ্ছেন, অযৌন প্রজাতিগুলো হয়তো আগে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল।
এতে দীর্ঘদিনের যৌন প্রজনন ছাড়া জীবন অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যর্থ হয়― ধারণাটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
কেন যৌন প্রজনন গুরুত্বপূর্ণ
যৌন প্রজনন ছাড়া অ্যামাজন মলির টিকে থাকা কেন এত বিস্ময়কর, তা বুঝতে হলে আগে জানতে হবে—যৌন প্রজননের অস্তিত্বই বা কেন?
জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণনাভিত্তিক জীববিজ্ঞানী এবং অ্যামাজন মলি বিষয়ক নতুন গবেষণার সহলেখক এডওয়ার্ড রাইসমেয়ার বলেন, 'যৌন প্রজনন আসলে বংশবিস্তারের একটি বেশ অদ্ভুত ও জটিল পদ্ধতি, তাই না?'
রাইসমেয়ার ব্যাখ্যা করেন, যৌন প্রজননের মূল্য অনেক। প্রতিটি প্রাণীকে সঙ্গী খুঁজতে হয় এবং তার জন্য প্রতিযোগিতা করতে হয়। প্রতিটি অভিভাবকও তাদের বংশগত উপাদানের মাত্র অর্ধেক অংশ সন্তানকে দেয়।
অনেক প্রজাতিতে প্রজনন প্রক্রিয়া অসম। স্ত্রীরা সন্তান উৎপাদন, গর্ভধারণ বা ডিমে তা দেওয়া এবং সন্তান লালন-পালনে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি ব্যয় করে।
অন্যদিকে অযৌন প্রজনন শুনতে অনেক সুবিধাজনক। সঙ্গী খোঁজার দরকার নেই। নিজের শতভাগ বংশগত উপাদানই পরবর্তী প্রজন্মে পাঠানো যায়।
তবুও জীবজগতের সর্বত্র যৌন প্রজননই প্রধান। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে বংশগত উপাদানের মিশ্রণ ও পুনর্বিন্যাসই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ডেভ স্পেইইয়ার বলেন, 'সামগ্রিক চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশই যৌন প্রজনন।'
তার মতে, এর একটি কারণ হলো যৌন প্রজনন জনসংখ্যাকে জিনগত "সম্ভাবনার স্থান" আরও দক্ষতার সাথে অন্বেষণ বা খোঁজার অনুমতি দেয়।
যৌন প্রজননের সময় দুই অভিভাবকের বংশগত উপাদান 'পুনঃসংযোজন' নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনর্বিন্যস্ত হয়। ফলে প্রতিটি সন্তান জিনের একটি অনন্য সমন্বয় পায়। এটি অনেকটা তাসের প্যাকেট বারবার উলটপালট করে নতুন করে বিলি করার মতো।
প্রতিবার নতুন একটি সমন্বয় তৈরি হয়, যা বিবর্তনের জন্য নতুন সম্ভাবনা পরীক্ষা করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
এর ফলে যৌন প্রজননকারী প্রজাতিগুলোর মধ্যে সাধারণত বেশি জিনগত বৈচিত্র্য থাকে। প্রত্যেক প্রাণীর জিনের সমন্বয় আলাদা হয়। এটি সাধারণত প্রজাতির টিকে থাকার জন্য উপকারী। তাছাড়া যৌন প্রজনন সুরক্ষাও প্রদান করে।
এই জিনগত পুনর্বিন্যাস না থাকলে জীবের জিনগত ভাণ্ডার 'মুলারের র্যাচেট' নামে পরিচিত ধীর কিন্তু ক্রমবর্ধমান একটি হুমকির মুখে পড়ে।
স্পেইইয়ার বলেন, 'যখন বংশগত উপাদানের অনুলিপি তৈরি হয়, তখন সবসময়ই কিছু ভুল থাকে।'
যৌন প্রজননকারী প্রজাতিতে এসব ভুল জিনের ভাণ্ডার থেকে ছেঁটে ফেলা যায়।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, এই ক্ষতিকর মিউটেশন বা ত্রুটিগুলো একটি একমুখী র্যাচেটের দাগের মতো তৈরি হতে থাকে বলে মনে করা হয় – যা জিনোমকে ধাপে ধাপে বা ক্লিকে ক্লিকে ক্ষয় করে, যতক্ষণ না প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এই ধারণা অনুযায়ী অযৌন প্রজাতিগুলোর আয়ু স্বল্প হওয়ার কথা। তাদের জিনগত অবক্ষয় অনিবার্য হওয়ার কথা।
তবুও অ্যামাজন মলির মতো কিছু প্রজাতি শুধু টিকেই নেই, বরং সফলভাবেও বেঁচে আছে।
একটি 'বিবর্তনীয় কেলেঙ্কারী'
অ্যামাজন মলি একা নয়।
প্রাণিজগতজুড়ে এমন আরও কয়েকটি অযৌন প্রাণী রয়েছে, যেগুলো তত্ত্ব অনুযায়ী যতদিন টিকে থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে টিকে আছে। যেমন: ঝোপঝাড়ে বসবাসকারী কাঠি-পোকার মতো প্রাণী থেকে শুরু করে থকথকে ক্ষুদ্রাকার 'অণুপ্রাণী'—সবখানেই এর উদাহরণ দেখা যায়।
এই প্রজাতিগুলো তথাকথিত 'কুমারী জন্ম' বা পার্থেনোজেনেসিসের আলোচিত ঘটনাগুলোর থেকে আলাদা।
পার্থেনোজেনেসিসে বন্দী অবস্থায় থাকা কিছু সাপ বা হাঙর সঙ্গী ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে পারে। তবে এটি যৌন প্রজননের স্থায়ী বিকল্প নয়। সুযোগ পেলে এসব প্রাণী আবার যৌন প্রজননে ফিরে যায়।
অন্যদিকে অ্যামাজন মলি এমন একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সদস্য, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাবাবিহীন জীবনধারার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
কীভাবে এই দীর্ঘজীবী অযৌন প্রাণীরা 'মুলারের র্যাচেট'-এর ভবিষ্যদ্বাণীকৃত পরিণতি এড়িয়ে যাচ্ছে, তা এখনো বিতর্কের বিষয়।
তবে কিছু প্রজাতি লাখ লাখ বছর ধরে যৌন প্রজননের কোনো সহায়তা ছাড়াই জিনগতভাবে সুস্থ অবস্থায় টিকে আছে বলে মনে হয়।
এবার আসা যাক বিডেলয়েড রোটিফারের কথায়।
যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক এবং রোটিফার বিশেষজ্ঞ কিয়ারা বোসকেত্তি বলেন, 'এদেরকে বিবর্তনের কেলেঙ্কারি বলা হয়েছে।'
এই থকথকে দেখতে প্রাণীগুলোর আকার একটি বালুকণার সমান। তবুও এদের দেহগঠন বিস্ময়করভাবে জটিল। এদের মাথা আছে, পরিপাকতন্ত্র আছে এবং দুটি ক্ষুদ্র পায়ের মতো দেখতে আঙুলও রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন মিঠাপানির পরিবেশে এদের দেখা যায়।
এরা 'প্রাচীন অযৌন প্রাণী' নামে পরিচিত একটি ছোট গোষ্ঠীর সদস্য। অর্থাৎ এটি এমন প্রাণী যারা লাখ লাখ বছর ধরে যৌন প্রজনন ছাড়াই অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
বিডেলয়েডদের ক্ষেত্রে পুরুষ ছাড়া কয়েক কোটি বছর কেটে গেছে। সেক্ষেত্রে অ্যামাজন মলির এক লাখ বছরের ইতিহাসও সংক্ষিপ্ত মনে হয়।
বোসকেত্তি বলেন, 'সত্যি বলতে আমরা জানি না তারা এত দীর্ঘ সময় কীভাবে টিকে আছে।'
তবে কিছু সূত্র রয়েছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়গুলোর একটি হলো, তাদের পরিবেশ থেকে বংশগত উপাদান সংগ্রহ করার ক্ষমতা। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'অনুভূমিক জিন স্থানান্তর'। বেশিরভাগ প্রাণী শুধু তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকেই জিন পায়। কিন্তু বিডেলয়েডরা সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন জীব থেকেও বংশগত উপাদান 'চুরি' করতে পারে।
এ ধরনের ঘটনা সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার মতো সরল জীবের মধ্যেই দেখা যায়।
তবে বোসকেত্তির কাছে এটিই সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় নয়। তিনি বলেন, 'এভাবে অর্জিত জিনগুলো তারা আসলেই বেঁচে থাকার জন্য ব্যবহার করে।'
কিছু জিন তাদের পানিশূন্যতা সহ্য করতে সাহায্য করে। অন্যগুলো রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বোসকেত্তি বলেন, 'আপনি তাদের শুকিয়ে ফেলতে পারেন, এমনকি রান্নাও করতে পারেন।'
তিনি মহাকাশ ভ্রমণ থেকে শুরু করে সাইবেরিয়ার চিরহিমায়িত মাটিতে ২৪ হাজার বছর জমে থাকার মতো চরম পরিস্থিতি সহ্য করার ক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে এই জিন চুরি যৌন প্রজননের জিনগত পুনর্বিন্যাসের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বোসকেত্তি বলেন, 'সম্ভবত এটি বৈচিত্র্য তৈরি করছে।'
কিন্তু অনুভূমিকভাবে স্থানান্তরিত জিনগুলো অযৌন জীবনধারাকে কতটা সহায়তা করছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বা সম্ভবত শুধু অনুভূমিক জিন স্থানান্তরই পুরো ব্যাখ্যা নয়।
বোসকেত্তির বিশ্বাস, ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিডেলয়েডরা নানা ধরনের কৌশলের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে।
তবুও কয়েক দশকের গবেষণার পরও তারা এক ধরনের বিবর্তনীয় 'ব্ল্যাক বক্স' হিসেবেই রয়ে গেছে।
সম্প্রতি পর্যন্ত অ্যামাজন মলির দীর্ঘায়ুর রহস্যও একইভাবে অজানা ছিল। এখন একটি নতুন গবেষণা দেখিয়েছে, কীভাবে এই মাছটি এত দীর্ঘ সময় টিকে আছে।
'কপি-পেস্ট' ব্যবস্থা
গবেষণার সহলেখক রাইসমেয়ার বলেন, 'তত্ত্বের একটি অংশ অনুপস্থিত ছিল। আর সেই অংশটি হলো জিন রূপান্তর।'
জিন রূপান্তর হলো বংশগত উপাদান মেরামতের একটি পদ্ধতি। এটি শুধু অ্যামাজন মলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষসহ বহু জীবের মধ্যেই এটি দেখা যায়।
আমাদের মতো যৌন প্রজননকারী প্রাণীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ জিনের দুটি কপি থাকে। একটি মায়ের কাছ থেকে আসে, অন্যটি বাবার কাছ থেকে।
যখন বংশগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেমন অতিবেগুনি রশ্মির কারণে, তখন কোষ কখনো কখনো একটি জিনের কপিকে অন্যটির মেরামতের ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়াকেই জিন রূপান্তর বলা হয়।
এটিকে প্রায়ই এক ধরনের 'কপি-পেস্ট' পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সময়ের সঙ্গে এটি জিনের দুটি কপিকে আরও বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ করে তুলতে পারে।
মানুষ এবং অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া নীরবে পটভূমিতে কাজ করে। যখনই ক্ষতি হয়, তখনই এটি মেরামতের কাজ করে।
কিন্তু অ্যামাজন মলির ক্ষেত্রে এটি জিনগত ভাণ্ডার রক্ষার কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হয়।
রাইসমেয়ার ও তার সহকর্মীরা বিভিন্ন প্রজন্মের অ্যামাজন মলির সম্পূর্ণ জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
তারা দেখতে পান, মাছটির বংশগত উপাদানের কিছু অংশ বারবার 'পুনর্লিখিত' হয়েছে। আর এটি যৌন প্রজননের মাধ্যমে নয়। বরং অন্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি হারে সংঘটিত জিন রূপান্তরের মাধ্যমে ঘটেছে।
এখানে জিন রূপান্তর অ্যামাজন মলির জিনগত ভাণ্ডারের জন্য অনেকটা সেই কাজই করছে, যা আমাদের ক্ষেত্রে যৌন প্রজনন করে। অর্থাৎ এটি ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তনের সঞ্চয় সীমিত করতে সাহায্য করছে।
একটি অযৌন প্রজাতি কীভাবে এত ব্যাপকভাবে জিন রূপান্তর করতে পারে, তা বুঝতে হলে এর উৎপত্তির দিকে তাকাতে হবে।
অধিকাংশ অযৌন প্রাণীর মতো অ্যামাজন মলিরও জন্ম হয়েছিল একটি আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে।
গবেষণা বলছে, প্রায় এক লাখ বছর আগে একটি স্ত্রী আটলান্টিক মলি এবং একটি পুরুষ সেইলফিন মলির মিলনের ফলে এ প্রজাতির উদ্ভব হয়।
খচ্চর বা লাইগারের মতো বেশিরভাগ সংকর জীব বন্ধ্যা হয়। কিন্তু এই মিলনের ফল তেমন ছিল না।
বরং এটি এমন একটি বংশধারা তৈরি করে, যা যৌন প্রজনন ছাড়াই বংশবিস্তার করতে সক্ষম।
ফলে আজকের প্রতিটি অ্যামাজন মলির মধ্যে দুটি পূর্বপুরুষ প্রজাতির বংশগত উপাদান রয়েছে। এটি শুরু থেকেই তাদের উচ্চ জিনগত বৈচিত্র্য দিয়েছে।
এবং 'মুলারের র্যাচেট'-এর বিরুদ্ধে এক ধরনের জৈবিক অগ্রগতি এনে দিয়েছে। এই দ্বৈত উত্তরাধিকারই সম্ভবত ব্যাপক জিন রূপান্তর করার ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি।
কারণ এর পূর্বপুরুষ দুটি প্রজাতি পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিল।
তাদের জিনগুলো একই ধরনের কাজ করার জন্য যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ, আবার বিভিন্ন ধরনের ছাঁচ সরবরাহ করার জন্য যথেষ্ট ভিন্নও।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই কপি-পেস্ট প্রক্রিয়া জিনগত ভাণ্ডারের সব জায়গায় সমানভাবে ঘটে না। কিছু নির্দিষ্ট অংশে এটি বেশি দেখা যায়।
রাইসমেয়ার বলেন, 'যেসব পরিবর্তনকে আমরা সবচেয়ে ক্ষতিকর, সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বলে আশা করি, জিনগত ভাণ্ডারের ঠিক সেই অংশগুলোতেই আমরা সবচেয়ে বেশি জিন রূপান্তর ঘটতে দেখি।'
এর ফল হলো এমন একটি প্রজাতি, যা এক লাখ বছর ধরে যৌন প্রজনন ছাড়াই থেকেও বিস্ময়করভাবে সুস্থ জিনগত অবস্থায় রয়েছে।
আবিষ্কারের গুরুত্ব
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু অ্যামাজন মলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
জিনগত 'ভুল' মোকাবিলার এই বিকল্প কৌশলগুলো বোঝা মানবজীববিজ্ঞানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কারণ ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন শুধু অযৌন প্রজাতির সমস্যা নয়।
রাইসমেয়ার বলেন, 'ক্যানসার মূলত জিনগত পরিবর্তনের একটি রোগ।'
তিনি আবিষ্কারের গুরুত্ব অতিরঞ্জিত করতে চান না। তবে তার মতে, জিনগত পরিবর্তন এবং প্রকৃতি কীভাবে তা মোকাবিলা করে—এসব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়াতে পারে এমন যেকোনো বিষয় দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হবে।
অন্যান্য দীর্ঘজীবী স্ত্রী-নির্ভর প্রজাতির ক্ষেত্রেও রাইসমেয়ার মনে করেন, জিন রূপান্তর সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
যৌন প্রজননের জিনগত পুনর্বিন্যাসের শক্তির একটি সত্যিকারের স্থিতিশীল বিকল্প অ্যামাজন মলি তৈরি করতে পেরেছে কি না, তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।
বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না, জিন রূপান্তর কতদিন পর্যন্ত 'মুলারের র্যাচেট'-কে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে।
তবে যে মাছটির অস্তিত্বই বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী থাকার কথা ছিল না, তার জিনগত স্বাস্থ্যের চিত্র আশ্চর্যজনকভাবে শক্তিশালী।
রাইসমেয়ার বলেন, 'আমরা ভেবেছিলাম জিনগত ভাণ্ডারকে সুস্থ রাখার একমাত্র সঠিক উপায় হলো যৌন প্রজনন। কিন্তু এখন আমরা জানতে পেরেছি, না—আরেকটি পথও আছে। একই ফলাফলে পৌঁছানোর জন্য এটি ভিন্ন একটি রাস্তা।'