মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল: ৮ বছরেও বসেনি গ্যাস পাইপলাইন, উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চতায় বিনিয়োগকারীরা
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে উন্নয়নকাজ শুরুর পর প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নিজস্ব গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন করা হয়নি। ফলে এখানকার বিনিয়োগকারীরা কারখানায় উৎপাদন শুরু করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
কারখানার নির্মাণকাজ শেষ করে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা বেশ কিছু কোম্পানি বলছে, গ্যাস সরবরাহ না থকায় কার্যক্রম পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের বৃহত্তম এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চীনা পোশাক অ্যাকসেসরিজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এসবিএস জিপার বাংলাদেশ কোং লিমিটেড এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন করেছে। আমদানি করেছে যন্ত্রপাতিও। বছরে ২৭ কোটি ১০ লাখ পিস জিপার, স্লাইডার, জিপারের বিভিন্ন অংশ, টেপ, প্লাস্টিকের বোতাম ও এ-সংক্রান্ত অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
তবে গ্যাস সংযোগ না থাকার কারণে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম থমকে আছে।
কোম্পানিটির জেনারেল ম্যানেজারের সেক্রেটারি লিন্ডসে টিবিএসকে বলেন, 'বেপজা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি কখন গ্যাস সংযোগ দেবে। এখন আর জুনে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব নয়। গ্যাস সংযোগ পেলে জুলাইয়ে উৎপাদন শুরু করা হবে।'
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু এসবিএস জিপার নয়, গ্যাসের মতো প্রয়োজনীয় শিল্প-ইউটিলিটি নিশ্চিত না হওয়ায় সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ উপায় না পেয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিছু প্রতিষ্ঠান।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পানির সংকটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র জানায়, বর্তমানে অল্প যে পরিমাণ পানি পাওয়া যাচ্ছে, তা লবণাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত। এ কারণে কম পানির প্রয়োজন হয়, এমন ড্রাই ইন্ডাস্ট্রিকে আকৃষ্ট করার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
কারখানা স্থাপনের জন্য বিনিয়োগকারীদের ২৮ ধরনের অনুমতি নিতে হয় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ থেকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে বাড়তি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
সূত্রমতে, মিরসরাইয়ের সিপি মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের স্টেশন থেকে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ নিজস্ব গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বেপজার একটি ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করার কথা থাকলেও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বসুন্ধরা গ্রুপ নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করেছিল। শুরুতে এখান থেকে বেপজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ না থাকায় সমস্যাটি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনামুল হক জানান, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) গ্যাস সংযোগের কথা বলা হয়েছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে বিনিয়োগ কার্যক্রমের গতি আসবে না। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে এলপিজি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আরো ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ প্রয়োজন হবে।'
অবশ্য সূত্র জানিয়েছে, ওই পাইপলাইনটি ব্যবহারের বিষয়ে বেজা ও বসুন্ধরা গ্রুপের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ইউটিলিটি চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
বেপজার কর্মকর্তা বলছেন, চট্টগ্রামের দুটি ইপিজেডে প্লট খালি না থাকা এবং মিরসরাই থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্র ও বিমানবন্দর কাছে হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল।
বেপজার নথিপত্রের তথ্যমতে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট ও দুটি ছয়তলা কারখানা ভবনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৫৪টি প্লট ও একটি কারখানা ভবন ৬১টি কোম্পানিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম চালু করে রপ্তানি শুরু করেছে। তিনটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি শুরুর অপেক্ষা আছে। এর বাইরে আরও ৩২টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারখানা ইউনিট নির্মাণাধীন রয়েছে।
গত এপ্রিল পর্যন্ত এ অঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০.৭৯ মিলিয়ন ডলার। আর রপ্তানি হয়েছে ৪৫.১৪ মিলিয়ন ডলার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৬ হাজার জনের।
চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের কোম্পানি।
বেপজার প্রাক্কলন অনুসারে, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে এতে বিনিয়োগের পরিমাণ হবে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। আর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে প্রায় ৪ লাখ মানুষের।
মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন হয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। এটিই বেপজার অধীনে থাকা সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৩ শতাংশ।
প্রকল্প পরিচালক এনামুল হক জানান, প্রকল্পের বাকি কাজগুলোও দ্রুত এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রচেষ্টা আছে।
