সব ওএসএস পোর্টালকে বাংলাবিজ-এ একীভূত করতে ৬৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তাব সরকারের
সিঙ্গল-এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে বিনিয়োগকারীদের ঝামেলামুক্ত ও দ্রুতগতির অনুমোদন সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে 'বাংলাবিজ' পোর্টালের সক্ষমতা বাড়াতে ৬৬১.৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে অচিরেই বছরের পর বছর ধরে চলে আসা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে পারেন বিদেশি-দেশি বিনিয়োগকারীরা।
এই প্রকল্পের আওতায় সরকার দেশের সব প্রধান বিনিয়োগ সংস্থাকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মের অধীনে নিয়ে আসবে। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই উদ্যোগের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিনিয়োগকারী-সংশ্লিষ্ট সব সেবাকে একটি একক ডিজিটাল ছাতার নিচে নিয়ে আসা। এর মাধ্যমে ব্যবসার প্রাথমিক নিবন্ধন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ছাড়পত্র পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সহজতর করা হবে।
বিডার নির্বাহী সদস্য ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বিস্তৃত সুবিধা আনা হবে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সরকারি সেবাকে বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, বাংলাবিজ প্রকল্পটি ইতোমধ্যেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির গ্রিন পেজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) জমা দেওয়া হয়েছে; সেটি এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ক্রমাগত উন্নয়নের উপযোগী ডিজাইন
হয়রানিমুক্ত এবং সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী বিনিয়োগ সুবিধা দিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বাংলাবিজ পোর্টাল চালুর ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ইতিমধ্যে বাংলাবিজের প্রথম পর্যায় চালুর অংশ হিসেবে ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে।
বিডার কর্মকর্তারা জানান, 'বাংলাবিজ পোর্টাল: সিঙ্গেল এন্ট্রি পয়েন্ট ফর ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিস (এসইপিআইএস)' শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে গত মাসে প্রকল্প যাচাই কমিটির বৈঠক হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করতে এখন একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কাজ করছে।
বিডার কর্মকর্তারা বলেন, আগামী ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক ব্যবহৃত সেবাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাবিজে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ডিজিটাল প্রস্তুতি ও সেবা-সমন্বয়ের অগ্রগতির ভিত্তিতে অবশিষ্ট সেবাগুলো পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে পোর্টালটির মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবাকে ডিজিটাল করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ণ বাস্তবায়ন
প্রকল্পটির মূল মাস্টারপ্ল্যানে বাংলাবিজের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সাল নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যা প্রয়োজন, ব্যবহারকারীর চাহিদা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত সম্প্রসারিত ও উন্নত হবে; যুক্ত হতে থাকবে নতুন নতুন সেবা ও ফিচার।
বিডার কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাবিজের প্রথম পর্যায় চালু হয়েছে। প্রথম ধাপে বিজনেস স্টার্টার প্যাক চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা একটি সিঙ্গেল-এন্ট্রি আবেদনের মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর প্রয়োজনীয় প্রাথমিক সেবাগুলো নিতে পারেন।
এর লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় প্রাথমিক নিবন্ধন ও অনুমোদন সম্পন্ন করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি করা।
দ্বিতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত সিঙ্গেল সাইন-অন, আরও বিস্তৃত 'নো ইয়োর অ্যাপ্রুভালস' সুবিধা ও অধিকসংখ্যক সরকারি সেবা ও অনুমোদন প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এতে সরকারি সেবা ও অনুমোদনের পরিসর আরও বাড়ানো হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় এই প্ল্যাটফর্মের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, ব্ল্যাক এন্ড ক্লাউড অবকাঠামোর সক্ষমতা ও ভবিষ্যতে আপগ্রেডেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
নিবন্ধন ও অনুমোদন মিলবে ৩ দিনে
কর্মকর্তারা জানান, এ প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় প্রাথমিক নিবন্ধন ও অনুমোদন সম্পন্ন করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি করা।
বিডার মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ সাহা রায় বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবা বাংলাবিজের মাধ্যমে পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, 'এটাকে আমরা বলছি বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট পোর্টাল। এর প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে। ২০৩০ সালের পর আর আলাদা কোনো পোর্টাল থাকবে না। একটি প্ল্যাটফর্মই থাকবে—বাংলাবিজ।'
ইউনিক বিজনেস আইডি
কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিটি ব্যবসার জন্য একটি 'ইউনিক বিজনেস আইডি' বা ইউবিআইডি চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে কার্যক্রম পরিচালনা, সম্প্রসারণ ও অন্যান্য পর্যায় পর্যন্ত তার অগ্রগতি বা ব্যবসার লাইফ সাইকেল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
কর্মকর্তারা মনে করেন, ইউবিআইডির মাধ্যমে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্য আরও কার্যকরভাবে আদান-প্রদান করা যাবে। ফলে একই ব্যবসায়িক তথ্য ও একই ধরনের কাগজপত্র বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে বারবার দাখিল করার প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সম্প্রতি পাশ হওয়া 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইনে'ও সিঙ্গেল ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্মের ধারণা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাবিজকে সরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসাসেবা ব্যবস্থার একটি স্থায়ী অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় আইনগত ও নিয়ন্ত্রক ভিত্তি তৈরি হবে।
'সাফল্যের জন্য পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি'
বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সনদ ও অনুমোদন পেতে ২-৩ বছর সময় লেগে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় একটি প্ল্যাটফর্মে আবেদন করে অনলাইনে স্বল্পসময়ের মধ্যে সব ধরনের লাইসেন্স ও অনুমোদন পাওয়া গেলে তা বিনিয়োগকারীদের হতাশা দূর করবে, দুর্নীতি ও হয়রানি কমাবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান বাবু টিবিএসকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বল্প সময়ে হয়রানিমুক্তভাবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে সরকার বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্ম চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা খুবই ইতিবাচক।
তিনি বলেন, 'এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বিনিয়োগ সহজ হবে। তবে অতীতে বিনিয়োগ সহজীকরণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষপর্যন্ত সেগুলো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। বাংলাবিজের ক্ষেত্রে যাতে তেমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে।'
