গাজা গণহত্যা, জেরুজালেম সাহিত্য উৎসব বর্জনের ঘোষণা নোবেলজয়ী সাহিত্যিক কুৎজির
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে জেরুজালেম সাহিত্য উৎসবে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক জে এম কুৎজি।
আয়োজকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কড়া ভাষার তিনি বলেন, 'নিজের নাম কলঙ্কমুক্ত করতে ইসরায়েলের বহু বছর লাগবে।'
দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত ৮৬ বছর বয়সী এই লেখক গত নভেম্বরে জেরুজালেম ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স ফেস্টিভ্যালের আয়োজকদের কাছে চিঠিটি পাঠান।
উৎসবের শিল্প নির্দেশক জুলিয়া ফেরমেন্তো-জাইসলার গত এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমকে চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানান। পরে কুৎজির ওই চিঠির কপি গার্ডিয়ানের হাতেও পৌঁছায়।
আগামী ২৫ থেকে ২৮ মে অনুষ্ঠেয় জেরুজালেম ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন কুৎজি।
চিঠিতে কুৎজি লেখেন, 'গত দুই বছর ধরে ইসরায়েল গাজায় এমন একটি গণহত্যামূলক অভিযান পরিচালনা করছে, যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হত্যাযজ্ঞমূলক উসকানির তুলনায় বহুগুণ বেশি অসম ও নির্মম।'
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)- পরিচালিত এই অভিযানে দেশটির অধিকাংশ জনগণ সমর্থন দিয়েছে। এ কারণে দেশটির বুদ্ধিজীবী ও শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনও এর দায় এড়াতে পারে না।
কুৎজি জানান, একসময় তিনিও ইসরায়েলের সমর্থক ছিলেন।
তিনি লেখেন, 'এখন পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েল ব্যাপক সমর্থন পেয়ে এসেছে। আমিও সেই সমর্থকদের একজন ছিলাম। আমি নিজেকে বোঝাতাম, একদিন নিশ্চয়ই ইসরায়েলি জনগণের বিবেক জাগ্রত হবে এবং যাদের ভূমি তারা দখল করেছে সেই ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো না কোনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। এই মনোভাব থেকেই আমি ১৯৮৭ সালে জেরুজালেম পুরস্কার গ্রহণ করতে সেখানে গিয়েছিলাম।'
তিনি আরও লেখেন, 'গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ সবকিছু বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সমর্থকেরাও এখন দেশটির সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এবং নাম কলঙ্কমুক্ত করতে ইসরায়েলের বহু বছর লাগবে।'
কুৎজি খুব কমই সাক্ষাৎকার দেন বা জনসমক্ষে উপস্থিত হন। তাকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত জীবিত লেখকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি দুইবার বুকার পুরস্কার পেয়েছেন এবং ২০০৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।
১৯৮৭ সালে জেরুজালেম পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে দেওয়া বক্তব্যে কুৎজি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সে সময় তিনি বলেছিলেন, 'দক্ষিণ আফ্রিকার সাহিত্য হলো শৃঙ্খলাবদ্ধ সাহিত্য। এটি পূর্ণ মানবিক সাহিত্য নয়। কারাগারে বন্দি মানুষ যে ধরনের সাহিত্য লিখবে, এটি ঠিক তেমনই।'
গার্ডিয়ান জুলিয়া ফেরমেন্তো-জাইসলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
তবে গত এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটকে তিনি বলেছিলেন, কুৎজি তার আমন্ত্রণের জবাবে 'অত্যন্ত কঠোর ভাষায়' প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন, যা তাকে 'স্তম্ভিত' করেছে।
ওয়াইনেটে প্রকাশিত জবাবি চিঠিতে ফেরমেন্তো-জাইসলার কুৎজিকে লেখেন, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন দক্ষিণ আফ্রিকান লেখক হিসেবে তার কাছ থেকে আরও সহমর্মিতা প্রত্যাশা করেছিলেন।
জাতিসংঘের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে 'গণহত্যার অভিপ্রায়ের সরাসরি প্রমাণ' পাওয়া গেছে। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েল গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা এবং চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
জেরুজালেম ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে এর আগে মার্গারেট অ্যাটউড, সালমান রুশদি, জনাথন ফ্রানজেন, জয়েস ক্যারল ওটস ও কার্ল ওভে নওসগার্ডের মতো লেখকেরা অংশ নিয়েছেন।
