গাজার 'পুরনো ছকেই' ইরানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যার পর দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে—এমনটা শুধু আশা-ই নয়, বরং একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এমনটা মনে করার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর ঘোষণাতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সরাসরি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বোমা হামলার পরও ইরানে দ্রুত 'সরকার পরিবর্তনের' সম্ভাবনা এখন অনেকটাই ফিকে মনে হচ্ছে। গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের দূরপাল্লার হামলার সময়ও ঠিক এমন চিত্রই দেখা গিয়েছিল।
শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে তেহরানের সরকারকে অকার্যকর করার কৌশল যে ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন স্পষ্ট। আর এটি বুঝতে পেরেই যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধের নতুন লক্ষ্য সামনে নিয়ে আসছে। অথবা এমনও হতে পারে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট, তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি সপ্তাহে যা বলেছেন, সেটাই হয়তো ইরানে হামলার 'আসল' কারণ।
চলতি সপ্তাহে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে মার্কিন শীর্ষ নেতারা বেশ সোজাসাপটা কথাই বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো, ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে পারে এমন অস্ত্র—যেমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও হামলাকারী ড্রোন—তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করা। সেই সঙ্গে ইরানের নৌবাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তেহরানের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়াও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এই ধারাবাহিকতায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম ও সন্দেহভাজন অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমা হামলার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের নৌযানগুলোর ওপরও হামলা জোরদার করা হচ্ছে। গতকাল (৪ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র জানায়, শ্রীলঙ্কার কাছে ভারত মহাসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর একটি জাহাজ তারা ডুবিয়ে দিয়েছে।'
বুধবার পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে বেশ মারমুখী ও দাম্ভিক রূপে দেখা যায়। তিনি ঘোষণা দেন, 'আমেরিকা চূড়ান্ত, ধ্বংসাত্মক ও নির্মমভাবে জয়লাভ করছে।' কেবল কথার জোরে যদি কোনো শত্রুকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যেত, তবে হেগসেথ যেন তার সবই ওই এক ভাষণে ঢেলে দিয়েছেন।
কয়েক দশক ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় একটি কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনা বা তৈরির সক্ষমতা হারিয়েছে ইরান। ফলে স্বাভাবিক সময়েও তারা ইসরায়েল এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার কাছে অনেকটাই অরক্ষিত। আর নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার ছাড়া ইরান ইসরায়েলের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। ফলে তেহরানকে পুরোপুরি তার শত্রুদের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে।
তখন তাদের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো কোনো প্রতিরোধব্যবস্থাই থাকবে না। ফলে যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া ইরানের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
এরই মধ্যে ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির আকাশে বি-৫২, বি-১ এবং বি-২-এর মতো কৌশলগত বোমারু বিমানগুলো অভিযান চালাচ্ছে। হেগসেথ দম্ভভরে আরও বলেন, ইরানের নেতারা এখন তাঁদের আকাশে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমানই দেখতে পাবেন, যা নেমে আসবে কেবল 'মৃত্যু ও ধ্বংস' নিয়ে।
ইসরায়েলের 'গাজা কৌশল'
যুক্তরাষ্ট্রের এই বোমা হামলার একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো, আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সম্পূর্ণ অকেজো করে দেওয়া। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিকটি সম্ভবত ইসরায়েলের হাতে রয়েছে, যার লক্ষ্য হলো তেহরানের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ধস নামানো।
খবর অনুযায়ী, তেহরানসহ অন্যান্য শহরের পুলিশ স্টেশন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগুলোকে নিশানা বানাচ্ছে ইসরায়েল। এর পাশাপাশি হাসপাতাল, স্কুল এবং বিশাল সব আবাসিক এলাকায় তারা হামলা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
থানা ও পুলিশ স্টেশনগুলো ধ্বংস হলে সরকারের পক্ষে দেশের ভেতরে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আর হাসপাতালে হামলার কৌশলটি সরাসরি ইসরায়েলের সেই পরিচিত 'গাজা প্লেবুক' বা গাজায় ব্যবহৃত ছক থেকেই নেওয়া। এর উদ্দেশ্যই হলো মানুষের কষ্ট ও যন্ত্রণা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া, যাতে তারা নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধেই ফুঁসে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চার দিনের বোমা হামলায় ইরানে সহস্রাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫৬ জনই শিশু। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় প্রাণ হারায় এই শিশুরা।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করা গেলে হয়তো শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের সেই আসল উদ্দেশ্যটি সফল হতে পারে। তবে শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে 'তাৎক্ষণিক' যে পতনের আশা করা হয়েছিল, এ প্রক্রিয়ায় তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে।
ইসরায়েল যেন তেহরানকেও গাজা উপত্যকার মতোই বিবেচনা করছে।
হামাসের পর পর কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে ইরানের নতুন নেতাদেরও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, গাজার এই কৌশল ইরানে কাজ না-ও করতে পারে—এমনটা ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রথমত, গোটা গাজা উপত্যকার চেয়ে তেহরান আকারে দ্বিগুণেরও বেশি বড়। এর জনসংখ্যাও গাজার চার গুণ। তেহরান হলো ৯ কোটি মানুষের এক বিশাল দেশের রাজধানী। ইসলামি বিপ্লবের সমর্থকেরা পুরো ইরানজুড়েই ছড়িয়ে আছেন। বিভিন্ন প্রদেশ ও শহরের নিজস্ব বেসামরিক ও নিরাপত্তাকাঠামোও রয়েছে।
ফলে রাজধানীর সামাজিক ও নিরাপত্তাকাঠামো ধ্বংস করলেই যে সরকার পতন হবে—এমন ভাবনা শুধু সুদূরপরাহতই নয়, বরং অবাস্তবও বটে।
সবকিছু নির্ভর করছে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। যেমন—ইরানি নেতৃত্বের টিকে থাকার সক্ষমতা, পুলিশ ও বেসামরিক সুরক্ষাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষের মনোবল, সর্বোপরি রিভল্যুশনারি গার্ডস কতটা কার্যকর থাকতে পারে, তার ওপর।
আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা সম্পন্ন করা এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) মাধ্যমে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন নিশ্চিত করা—এই দুটি কাজ আবেগের পাশাপাশি লজিস্টিক বা প্রস্তুতির দিক থেকেও ইরানি নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জানাজার অনুষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া গেলেও, নতুন নেতার নির্বাচন পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।
সারা দেশে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে ইরান হয়তো ব্যর্থ হয়েছে। তবে গত জুনের মতো এটিকে সাধারণ কোনো যুদ্ধ হিসেবে দেখছে না তারা; বরং এটিকে নিজেদের 'অস্তিত্বের জন্য হুমকি' হিসেবে বিবেচনা করে সংঘাতের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মিত্ররা হয়তো আশা করেনি ইরান এত দ্রুত পাল্টা জবাব দেবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খোদ ওই অঞ্চলেই সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে দেবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব এবং ইরাকে মার্কিন ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় ইরানের ঝটিকা হামলা পুরো অঞ্চলকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাসসহ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে কর্মী সরিয়ে নিচ্ছে।
এটি স্পষ্ট যে, যুদ্ধের পরিধি বাড়িয়ে এটিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দাঁড় করানোকেই ইরান সবচেয়ে ভালো বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা তাদের নেই। ইসরায়েলকে বড় কোনো শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও এখন সীমিত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এরই মধ্যে সারা দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার স্থান ও যানগুলো খুঁজে বের করে হামলা চালাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে তেহরান হয়তো হিসাব কষে দেখেছে—উপসাগরীয় দেশগুলো এবং গোটা বিশ্বের জন্য এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মাশুল বাড়িয়ে তোলাই বিনা শর্তে যুদ্ধবিরতি আদায়ের সবচেয়ে ভালো সুযোগ। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় বাজি। এখন দেখার বিষয়, তেহরানের এই বাজি শেষ পর্যন্ত সফল হয় কি না।
