সরকারি উদ্যোগে এই প্রথম হাম, জলাতঙ্ক, ডেঙ্গুর টিকা ও অ্যান্টিভেনম উৎপাদন করবে এসেনশিয়াল ড্রাগস
দেশে প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক ও হামের টিকা এবং অ্যান্টিভেনম (সাপের কামড়ের প্রতিষেধক) উৎপাদন করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের টিকার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
এসেনশিয়াল ড্রাগস সূত্রে জানা গেছে, দেশের বাজারে এসব টিকার ব্যাপক চাহিদা থাকায় এগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এসেনশিয়াল ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এ সামাদ মৃধা টিবিএসকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে কোম্পানিটি জরুরি ভিত্তিতে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, সাপের কামড় ও হাম বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব রোগ প্রতিরোধে স্থানীয়ভাবে টিকা উৎপাদন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সামাদ মৃধা আরও বলেন, 'আমরা এক বছরের মধ্যে এই চারটি টিকার উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি আগামী বছরের জুনের মধ্যে উৎপাদন শুরু করে সরকারের কাছে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।'
এসেনশিয়াল ড্রাগস জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চালু হলে বছরে প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি ভায়াল টিকা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে দেশে এই চার ধরনের টিকার মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ ডোজ। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত টিকা বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
সামাদ মৃধা বলেন, বর্তমানে সরকার যে দামে এসব টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করে, তার প্রায় অর্ধেক মূল্যে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এর ফলে সরকারের ব্যয় কমার পাশাপাশি টিকার সহজলভ্যতা বাড়বে।
দেশে এ বছর হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত হামে শিশু মৃত্যু ৩২০ ছাড়িয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় এ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও প্রতি বছর ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ২০২৫ সালে দেশে ৪১৩ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছে, আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২৬৭৩ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) উচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সি শিশুদের জন্য তাকেদা-র তৈরি লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড ডেঙ্গু টিকা 'কিউডেঙ্গা' (টিএকে-০০৩) ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। ২০২৪ সালের মে মাসে এই টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক-যোগ্যতা অর্জন করে।
এসেনশিয়াল ড্রাগস 'কিউডেঙ্গা' (টিএকে-০০৩) উৎপাদন করার পরিকল্পনা করছে।
এছাড়া বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিভেনম এবং জলাতঙ্ক নিরোধী টিকার সংকট রয়েছে। প্রতি বছর অ্যান্টিভেনমের অভাবে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে
সাপের কামড়-সংক্রান্ত বাৎসরিক এক সমীক্ষা অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫০০ জনের বেশি মারা যায়। আক্রান্তদের এক-চতুর্থাংশ বিষধর সাপের কামড়ের শিকার হয়, ১০.৬ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ও ১.৯ শতাংশ মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়, সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার অনেকটাই বেশি হলেও দেশে বর্তমানে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার ৫০০ গবাদিপশুও মারা যাচ্ছে সাপের কামড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশে এই চারটি টিকা উ'পাদিত হলে একদিকে সরকারের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য টিকাও সহজলভ্য হবে।
এদিকে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে আরেকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এসেনশিয়াল ড্রাগস। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সেখানে প্রায় ১০ একর জমির ওপর ভ্যাকসিন, থেরাপিউটিক ও ডায়াগনস্টিক রিসার্চ সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানান, ২০৩২ সালের মধ্যে এই কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়াও সংস্থাটির হাতে অ্যান্টিভেনম, জলাতঙ্ক-প্রতিরোধী, জেনেরিক ওষুধ এবং গবেষণা ও ডায়াগনস্টিকসহ মোট চারটি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সরকারের ওষুধ ও টিকার চাহিদা পূরণে বড় ধরনের সক্ষমতা অর্জন করবে এসেনশিয়াল ড্রাগস।
