ইরান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-নির্ভর নিরাপত্তা ব্যর্থ, আসছে অস্ত্র ক্রয়ের নয়া প্রতিযোগিতা
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে বিশ্ব অর্থনীতির পুরো কাঠামোকেই যেন আঘাত করেছে ইরান যুদ্ধ। ফলে ইরানের প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকেও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ ধনাঢ্য এসব দেশের সংঘাত পরবর্তী নীতিকে গভীরভাবে পরিবর্তন করবে। এমনকী নিরাপত্তা জোটেও আসতে পারে দৃশ্যমাণ পরিবর্তন।
পারস্য উপসাগরঘেষা মধ্যপ্রাচ্যের যে ছয়টি দেশ এক সময় ছিল কেবল মরুভূমি আর বালিয়াড়ির দেশ—তাদেরই আকাশচুম্বী অট্টালিকা, অত্যাধুনিক অবকাঠামো ও বিলাসব্যসনের আয়োজন এখন নজর কাড়ে। তেল ও গ্যাসের বিপুল মজুত আবিষ্কারের পর থেকেই রাজতন্ত্র-শাসিত এসব ভূখণ্ডের পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তবে সবচেয়ে রূপান্তর ঘটে অবকাঠামোর পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশে। তেল-গ্যাস বিক্রির কাঁড়ি কাঁড়ি পেট্রোডলার তারা বৈশ্বিক পুঁজিবাজার, বন্ড ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করতে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে করা এসব বিনিয়োগের বেশিরভাগটাই করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম বিনিয়োগ তহবিলগুলো। সিংহভাগ বিনিয়োগ অবশ্য পেয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শীর্ষ কোম্পানিগুলো।
এই বিনিয়োগ থেকে আসা লভ্যাংশও এসব তহবিলকে ফুলেফেঁপে উঠতে সাহায্য করে। এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ তহবিল আমিরাতের 'আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি'-এর কথাই ধরুন। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের সম্পদমূল্য ১ হাজার ১৮৭ বিলিয়ন ডলার। এরপরেই রয়েছে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, যার সম্পদমূল্য ১ হাজার ১৫১ বিলিয়ন ডলার। কুয়েত ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি ১,০০২ বিলিয়ন ডলারের অধিকারী, কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি'র ক্ষেত্রে তা ৫৮০ বিলিয়ন ডলার।
এই অঞ্চলের অন্যান্য সার্বভৌম তহবিলের মধ্যে আরও রয়েছে– ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব দুবাই, যার সম্পদমূল্য ৪২৯ বিলিয়ন ডলার; মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (৩৫৮ বিলিয়ন), লিমাদ (৩০০ বিলিয়ন), এমিরেটস ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (১১৬ বিলিয়ন) এবং ওমান ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (৫৩ বিলিয়ন ডলার)।
এই রাষ্ট্রীয় তহবিলগুলো শুধু নতুন সম্পদই তৈরি করেনি, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের আরও প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সোপান। এমনকী যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে শীর্ষ পুঁজিসরবরাহকারী হয়ে ওঠে এসব বিনিয়োগ।
এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো বৈচিত্র্যকরণেরও উদ্যোগ নেয় উপসাগরীয় দেশগুলো। যেমন আরব আমিরাত ও কাতার এয়ারলাইন শিল্প ও সহায়ক কাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈশ্বিক এভিয়েশন হাব হয়ে ওঠে। সৌদি আরবও সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটনখাতের বিকাশে বিপুল অর্থ লগ্নি করতে শুরু করে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০'র আওতায় বিভিন্ন উদারমুখী সংস্কারের পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
ইতোমধ্যেই সুফলও তারা পেতে শুরু করেছিল। যেমন এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাখাতের ডেটা সেন্টারগুলো পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুৎশক্তির প্রয়োজন হয়। মধ্যপ্রাচ্যে সস্তায় জ্বালানি লাভের সুযোগ থাকায়—যুক্তরাষ্ট্রের বড় কিছু এআই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এসব দেশে তাদের বিশালাকায় ডেটা সেন্টারও গড়ে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ চলাকালে ইতোমধ্যেই এসব স্থাপনা ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।
ইরান যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর দুর্গতি
কেবল ডেটা সেন্টার নয়, ইরানি অবকাঠামোয় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক স্থাপনাতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান। যা থেকে বাদ যায়নি তাদের প্রধান আয়ের উৎস জ্বালানি স্থাপনাগুলোও।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন ও ব্যালেস্টিক মিসাইল এসব দেশের বিমানবন্দর, সমুদ্র বন্দর, আর্থিক কেন্দ্র, বিলাসবহুল আবাসন এলাকাসহ বহু স্থানেই আঘাত হেনেছে। এতদিন নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জৌলুসের যে হাতছানি দিয়ে বিশ্বের ধনীদের আকর্ষণ করেছিল দুবাই, আবুধাবির মতো উপসাগরীয় হাবগুলো—তারাই এখন গভীর নিরাপত্তাহীনটায় ভুগছে।
ইরানি হামলার জবাবে এপর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপই গ্রহণ করেছে। ইন্টারসেপ্টর মিসাইল দিয়ে এপর্যন্ত ইরানের ছোঁড়া প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা। কিন্তু, সংখ্যাটা যাই হোক—যুদ্ধের আঁচে নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা তারা এড়াতে পারেনি। ফলে যুদ্ধ শুরুর পর বহু পশ্চিমা নাগরিককে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চলেও যেতে হয়। বিমানসেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেক ধনকুবের এমনকী প্রাইভেট জেটে চেপেও ছাড়েন সংঘাতময় অঞ্চল।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা করে ইসরায়েল।পাল্টা জবাবে তেহরান একই গ্যাসক্ষেত্রের কাতারের মালিকানায় থাকা রাস লাফান অংশেও হামলা করে।
গত ২০ মার্চ আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর কাতারের রাস লাফান শিল্প নগরীর একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় আঘাত হানে। কাতার জানিয়েছে, এই হামলার ফলে সেখানে তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে পাল্টা আঘাত হানার অঙ্গীকার এভাবেই বাস্তবায়ন করে দেখায় ইরান। এতে রাস লাফান শিল্প নগরীর একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং কাতার তার এলএনজি রপ্তানির সক্ষমতা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হারায়।
এই হামলার পরেই আরব আমিরাত তার হাবশান ও বাব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয়। কুয়েতের জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলা চালায় ইরান। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি কেপিসি জানায়, তাদের মিনা আল-আহমাদি পরিশোধনাগারে একাধিক ড্রোন আঘাত হেনেছে। সৌদি আরবও তাদের একাধিক জ্বালানি তেলের পরিশোধনাগার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে উল্লেখ করে।
এছাড়া, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বাধা উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলোর জন্য চরম আঘাত হয়ে এসেছে। অথচ এই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্তত ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়।
এসব ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্টও হয়ে ওঠে। আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর পুরনো নিরাপত্তা কাঠামো আর কাজ করছে না। বরং মার্কিন ঘাঁটি থাকার কারণেও এসব দেশ ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হয়েছে। নিজস্ব সামরিক বাহিনীর দুর্বলতাও তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলি বাকির দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, "জিসিসির দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধ একটি গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতা উন্মোচন করেছে: যুদ্ধরত তিন পক্ষই (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান) ক্রমশ অযৌক্তিক হয়ে উঠছে এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, প্রত্যেকেই এমন এজেন্ডা অনুসরণ করছে যা এই অঞ্চল এবং বিশ্বকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।"
উপসাগরীয় দেশগুলো আরও সন্দেহ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইসরায়েলের প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে এবং ইসরায়েল গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। চলতি সপ্তাহে দ্য ইকোনমিস্ট-এ লেখা এক নিবন্ধে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র "নিজের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।" উপসাগরীয় এক শীর্ষ নেতা ব্যক্তিগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর "পুডল" (এক প্রজাতির পোষা কুকুর) বলেও উল্লেখ করেছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ফাওয়াজ গারগেস গার্ডিয়ানকে বলেন, "আমি মোটেও মনে করি না কোনো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্র কখনও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হবে, কারণ তারা বারবার বলেছে—এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। তারা মনে করে, এটি এমনকি আমেরিকারও যুদ্ধ নয়।"
এশিয়া টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্ব মোড়ল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও এখন তলানিতে। ১৯৪৫ সালের পর যে দেশটি বিশ্বজুড়ে নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, আজ নিজেদের শুরু করা যুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাদেরই এমন দেশগুলোর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, যাদের তারা একসময় সুশাসন ও শান্তির শিক্ষা দিত।
উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত ধনী। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা আধুনিক অস্ত্র ও যুদ্ধবিমানও তাদের কাছে আছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান—এই ছয়টি দেশ নিয়ে গঠিত জিসিসি জোটের হাতে সম্মিলিতভাবে প্রায় দুই হাজার এফ-১৫ ও এফ-১৮ যুদ্ধবিমান রয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা শক্তিগুলো আরও অস্ত্র বিক্রির জন্য প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তবে বৃহৎ পরিসরের আকাশযুদ্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে মূলত সৌদি আরবের, এবং তুলনামূলকভাবে সীমিত আকারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের।
এই বাস্তবতায়, নতুন করে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের জোয়ার দেখা যেতে পারে।
প্রতিরক্ষায় নতুন উদ্যোগ যেমন হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যদি ইরানের সঙ্গে সত্যিই কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে যেতে পারে, তাহলেও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন এখন অনেকটা নিশ্চিত।
২০১৯ সালে যখন হুথিরা সৌদির বৃহৎ একটি জ্বালানি স্থাপনায় সফলভাবে হামলা চালায়, তখনই সৌদি আরব আকাশ প্রতিরক্ষার গুরুত্ব নতুন করে উপলদ্ধি করতে শুরু করে। এই খাতে তখন থেকেই ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে রিয়াদ। উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোও এই ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। যার ফলে সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময়ে তারা ইরানের ছোঁড়া ৮৫ শতাংশ ড্রোন ও মিসাইল ভূপাতিত করার দাবি করতে পেরেছে।
অন্যদিকে, এই অঞ্চলের মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ইসরায়েলকে উদ্দেশ্য করে উৎক্ষেপণ করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতেই বেশি সক্রিয় থেকেছে। এমনকী কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের ঘাঁটি রক্ষার চেয়েও তেল আবিবের সুরক্ষাকে যুক্তরাষ্ট্র বেশি প্রাধান্য দিয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক স্কট রিটার সাম্প্রতিক সময়ের এক পডকাস্টে উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রকটভাবে তুলে ধরেছে মার্কিন সাম্রাজ্যের দুর্বলতা। এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরের আরব দেশগুলো এটাও বুঝতে পেরেছে, আমেরিকান শক্তির ভরসায় তাদের নিরাপদ দিন গুজরানের সময় শেষ। এসব দেশ বিপুল অর্থ দিয়ে মার্কিন অস্ত্র-সরঞ্জাম কিনলেও–বেশিরভাগ সময়ে সেগুলো পরিচালনা করেছে মার্কিন সেনারা।
জাতিসংঘের সাবেক এই অস্ত্র পরিদর্শক আরও মনে করেন, এখানে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সামনে এক নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। কারণ এই যুদ্ধ শেষ হলেও— আগামীর ঝুঁকি মোকাবিলা মাথায় রেখেই এখন জিসিসি-ভুক্ত দেশগুলোকে নতুন হুমকিগুলো মোকাবিলার জন্য অস্ত্রসজ্জা ও দক্ষ সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে যতই বলুন যে, ইরান যুদ্ধ তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। বরং তাঁরা উপলদ্ধি করছেন, প্রতিরক্ষা নির্ভরতা বহুমুখীকরণের তাগিদ।
আড়ালের এই বাস্তব চিত্রটি আরও জটিল। উপসাগরীয় নেতৃত্বের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি প্রবণতা জোরালো হচ্ছে—এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা। তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখছেন। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া কিংবা অন্যান্য শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর পথও খুঁজছেন, যাতে ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানো যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর আগেই উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প নিরাপত্তা কৌশল নেওয়ার ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিল। সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং তুরস্ককে সেই চুক্তির কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনাও চলছিল। বাহরাইনের যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা তারা অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও করতে চায়। একই সময়ে, সংযুক্ত আরব আমিরাত জানুয়ারিতে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শিগগিরই উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ক্রয়নীতিতেও দেখা যেতে পারে। উপসাগরের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীগুলো এখন বৈশ্বিক সরবরাহকারীদের প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। রিয়াদে সাম্প্রতিক প্রদর্শনীগুলোতে বোয়িং, লকহিড মার্টিন এবং আরটিএক্স-এর মতো পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহকারীদের পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া ও তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও অংশ নিয়েছে।
কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি ইউক্রেনের সঙ্গে পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর লক্ষ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তি—বিশেষ করে ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা—অর্জন করা। এর মাধ্যমে তারা বর্তমানে ব্যবহৃত ব্যয়বহুল মার্কিন ইন্টারসেপ্টরগুলোর ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী মিসাইল। এতে খোদ তাদের ইন্টারসেপ্টর ভাণ্ডারেই এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা পূরণ করতে আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এরমধ্যে উপসাগরীয় মিত্রদের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর আমেরিকা দিতে পারবে কিনা– এনিয়েও রয়েছে আশঙ্কা। এই প্রেক্ষাপটে, রুশ ড্রোন মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা অর্জন করা ইউক্রেনের সঙ্গে চুক্তিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নৌ-ড্রোন প্রযুক্তিও উন্নয়ন করেছে, যা ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খোলা রাখতে সহায়ক হতে পারে।
কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—উপসাগরীয় এই তিন দেশ স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও জোর দিচ্ছে। তারা এমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যেখানে তাদের বিপুল অঙ্কের সার্বভৌম তহবিল ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। সৌদি আরবে প্রতিরক্ষা স্থানীয়করণ প্রকল্পে যুক্ত এক নির্বাহী জানান, এই খাতে অগ্রগতি দ্রুততর করার জন্য ইতোমধ্যেই চাপ বাড়তে শুরু করেছে। তবে এই উদ্যোগ বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে—বিশেষ করে প্রযুক্তি ও জ্ঞান হস্তান্তরের প্রশ্নে। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের মেধাস্বত্ব ছেড়ে দিতে অনাগ্রহী, বিশেষ করে এমন দেশগুলোর ক্ষেত্রে যাদের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রাধান্য পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা নিকট ভবিষ্যতে হয়তো সম্ভব নয়। তবে সামরিক জোট ও অস্ত্র ক্রয়ের নেটওয়ার্ক ক্রমেই আরও বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠবে—এমন প্রবণতা এখন স্পষ্ট।
আর এই নতুন অস্ত্রসজ্জার অর্থায়নে নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা রাখবে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম তহবিলগুলো। আর সেটি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন মুনাফা অর্জনের উৎসই হবে।
সৌদি আরব একাই গত পাঁচ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এবং বিশ্বের শীর্ষ ১০টি সামরিক ব্যয়কারী দেশের মধ্যে রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারও প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট অর্থনীতি বাহরাইনও নিয়মিতভাবে তার জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করে আসছে।
ইরান যুদ্ধের এই প্রবণতাকে আরও উস্কে দিয়েছে। জ্বালানি সংকট ঘটিয়ে বিশ্বব্যাপী লাখো কোটি মানুষের জীবিকা বিপন্ন করলেও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই যুদ্ধ তাই এক আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। যুদ্ধে শেষ হলেও—আঞ্চলিক উত্তেজনা রয়েই যাবে, যে পরিস্থিতিও তাদের জন্য অনুকূল হবে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, স্কট রিটার ইউটিউব পডকাস্ট, সেমাফোর ডটকম, মিলিটারি ম্যাগাজিন
