ইরান বন্ধ করে দিয়েছে হরমুজ, ট্রাম্পেরও অবরোধের হুঁশিয়ারি, প্রণালিতে কি ঘটতে যাচ্ছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এই জলপথটি নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার জন্য তিনি বারবার ইরানকে তাগিদ দিয়ে আসলেও, এখন নিজেই এটি অবরোধ করার কথা বলছেন।
রোববার সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, 'বিশ্বের সেরা মার্কিন নৌবাহিনী অবিলম্বে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশকারী বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা যেকোনো এবং সব ধরণের জাহাজ অবরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। আমরা এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে চাই যেখানে সবাই অবাধে যাতায়াত করতে পারবে, কিন্তু ইরান তা হতে দিচ্ছে না।'
যে কারণে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করতে চান ট্রাম্প
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের জন্য ইরান এই প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কেন একটি জলপথ অবরোধ করতে চাচ্ছেন যা তিনি নিজেই খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন?
বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালিটি কারিগরিভাবে পুরোপুরি বন্ধ নেই। অভিযোগ রয়েছে, ইরান প্রতিটি ট্যাংকার পার করে দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত 'টোল' আদায় করছে। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধের মধ্যেও ইরান এই পথ দিয়ে নিজের তেল রপ্তানি পুরোদমে সচল রেখেছে।
তথ্য ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান গত মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যা যুদ্ধের আগের তিন মাসের তুলনায় দৈনিক গড়ে প্রায় ১ লাখ ব্যারেল বেশি। মূলত ইরানের এই একপেশে সুবিধা বন্ধ করতেই ট্রাম্প পাল্টা অবরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প ইরান সরকার ও দেশটির সামরিক অভিযানের অর্থায়নের একটি প্রধান উৎস বন্ধ করে দিতে পারেন। তবে এটি এমন একটি কৌশল যা ট্রাম্প প্রশাসন আগে ব্যবহার করতে চায়নি। কারণ ইরানি তেলসহ এই প্রণালী পুরোপুরি অবরোধ করলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আরও মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই কারণেই মার্কিন নৌবাহিনী এতদিন ইরানি ট্যাংকারগুলোকে ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়ে আসছিল। কারণ এই মুহূর্তে ওই অঞ্চল থেকে যেকোনো তেলের সরবরাহ তেলের দামকে অন্তত কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে। এমনকি গত মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ট্যাংকারে ভাসমান তেল বিক্রির জন্য একটি সাময়িক লাইসেন্সও প্রদান করেছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির অপরিশোধিত তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। তবে গত মাসে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল যুক্ত হয়েছে।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল, যা প্রায় দেড় দিনের পুরো বিশ্বের তেলের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
নিষেধাজ্ঞার ওপর এক মাসের এই সাময়িক ছাড়ের বিষয়টি বাহ্যিকভাবে বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। কারণ, এই অনুমতির ফলে ইরান তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা তেল বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের রসদ জোগানোর সুযোগ পায়। এমনকি এই তেল বিক্রি থেকে ইরান বেশ ভালো মুনাফাও করছিল। আন্তর্জাতিক বাজারদর 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর চেয়েও কয়েক ডলার বেশি দামে তারা এই তেল বিক্রি করছিল।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপে ছিল। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক কোটি ব্যারেল তেল বাজারে আসার বিষয়টি সরকারের জন্য কিছুটা সময় বাড়িয়ে দেয়। যেহেতু ইরান আগে থেকেই তেল বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছিল, তাই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার ফলে সেই তেল কেবল চীনের হাতে না গিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কেনার পথও খুলে যায়। উল্লেখ্য, চীন বরাবরই ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
যুদ্ধ চলাকালীন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন সম্ভাব্য সব উপায়েই চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বজুড়ে তেলের জরুরি মজুত ছাড়ার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এছাড়া, গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক কোটি ব্যারেল রুশ তেলের ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, 'ইরান তাদের পছন্দের মানুষের কাছে তেল বেচে টাকা কামাবে আর যাদের পছন্দ করে না তাদের যেতে দেবে না—এমনটা আমরা হতে দেব না।' তার নীতি হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে হয় সবাই যাতায়াত করবে, নতুবা কেউই পারবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য হয়।
সিবিএস নিউজের 'ফেস দ্য নেশন' অনুষ্ঠানে ওহাইওর রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক টার্নার বলেন, হরমুজ প্রণালির সংকট নিরসনে এই অবরোধ একটি অন্যতম মাধ্যম। তার মতে, প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কারা যাতায়াত করবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধু ইরানের একার নয়। এর মাধ্যমে তিনি আসলে সব মিত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ সদস্য মার্ক ওয়ার্নার সিএনএনকে বলেন, 'আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে এই জলপথ অবরোধ করে ইরানকে সেটি উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা যাবে।'
ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণা মার্কিন বাহিনীর; হরমুজের কাছে সামরিক জাহাজের উপস্থিতি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন: আইআরজিসি
এদিকে, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির সকল বন্দর আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে অবরোধ করার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
রোববার (১২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১৩ এপ্রিল স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সকল সামুদ্রিক যানের ওপর এই অবরোধ কার্যকর হবে।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলসহ ইরানের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াতকারী 'সকল দেশের জাহাজ' এই অবরোধের আওতায় থাকবে।
সেন্টকম জানিয়েছে, 'ইরানি বন্দর বাদে অন্য দেশের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের স্বাধীনতায় মার্কিন বাহিনী কোনো বাধা দেবে না।'
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক কঠোর সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, কোনো বিদেশি সামরিক জাহাজ যদি হরমুজ প্রণালির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ইরানের নৌবাহিনীর 'স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট' এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিবৃতিতে আইআরজিসি আরও যোগ করেছে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বেসামরিক বা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য খোলা আছে। তবে তাদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিয়মকানুন মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের প্রভাব কী হবে?
গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। এই চুক্তির অন্যতম একটি শর্ত ছিল এই সরু জলপথ দিয়ে জাহাজগুলোর 'নিরাপদ যাতায়াত' নিশ্চিত করা।
তবে বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ওই এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়, অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের 'লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ধ্বংস করে দেওয়া হবে'। ফলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রথম তিন দিনে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ এই পথে যাতায়াত করার সাহস দেখিয়েছে।
মেরিন ট্রাফিক থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ১০ এপ্রিল স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত মাত্র ১৯টি জাহাজকে এই প্রণালি পার হতে দেখা গেছে।
এই ১৯টি জাহাজের মধ্যে মাত্র চারটি ছিল তেল, গ্যাস বা রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার। বাকিগুলো ছিল বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী (বাল্ক ক্যারিয়ার) কন্টেইনার জাহাজ। এছাড়া, কিছু জাহাজ নিজেদের অবস্থান প্রকাশ না করেই এই পথ পাড়ি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ যাতায়াত করত। সেই তুলনায় বর্তমান সংখ্যাটি অত্যন্ত নগণ্য।
তবে, স্বল্পমেয়াদে ট্রাম্পের এই নৌ-অবরোধের হুমকির প্রভাব খুব সামান্যই হবে বলে মনে করছেন জাহাজ চলাচল বিশেষজ্ঞ লার্স জেনসেন। বিবিসিকে তিনি বলেন, বর্তমানে এই জলপথ দিয়ে খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। মার্কিনরা যদি এই অবরোধ কার্যকরও করে, তবে তা কেবল হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে থামাবে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এতে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না।
ভেসপুচি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন আরও বলেন, ইরানকে টোল দেওয়া জাহাজগুলোর চলাচল আটকে দেওয়ার হুমকিরও খুব একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ যেকোনো কোম্পানি যদি ইরান সরকারকে অর্থ প্রদান করে, তবে তারা এমনিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে।
জেনসেনের মতে, 'প্রথমত, এখন খুব কম জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে। টোল দেওয়া জাহাজের সংখ্যা তার চেয়েও কম। আর যারা টোল দিচ্ছে, তারা আগে থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে।'
তিনি আরও জানান, অধিকাংশ জাহাজ কোম্পানি এখন একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য অপেক্ষা করবে এবং দেখবে সেই চুক্তি বজায় থাকে কি না। যদি সত্যিই শান্তি ফেরে, তবে এই পথে ধীরে ধীরে আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।
