মার্কিন পাইলটের উদ্ধারকে ‘ইস্টারের অলৌকিক ঘটনা’ বললেন ট্রাম্প, ধর্মীয় ভাষা ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অন্যান্য শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানে একজন মার্কিন পাইলটকে উদ্ধার করার ঘটনাকে গত রবিবার 'ইস্টারের অলৌকিক ঘটনা' অভিহিত করেছেন। তারা এই যুদ্ধকে একটি ন্যায়সঙ্গত এবং ঐশ্বরিক আশীর্বাদপুষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে চিত্রায়িত করতে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করছেন, যা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অতীতে মার্কিন প্রশাসন সাধারণত ইস্টারে কার্ডের মতো সাধারণ শুভেচ্ছা বিনিময় করত। তবে সমালোচকরা বলছেন, এবার কর্মকর্তাদের বার্তাগুলো ধর্মকে যুদ্ধের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যকার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দিয়েছে।
এনবিসি-র 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, 'এই উদ্ধার অভিযানটি ছিল ইস্টারের একটি অলৌকিক ঘটনা।' এর পরপরই তার মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যও একই ধরণের বার্তা দেন।
ধর্মকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে কড়া হুমকিও দিয়েছেন। তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তেহরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ইরানিদের 'ক্রেজি' বলে গালি দেন এবং তার বার্তার শেষে 'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য' বাক্যটিও ব্যবহার করেন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইস্টারের প্রতীকী তাৎপর্য টেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, 'ইতিহাসের সবথেকে বড় বিজয় হলো ইস্টারের অলৌকিক ঘটনা। তাই খ্রিষ্টানদের এই পবিত্র দিনে শত্রুবেষ্টনী থেকে একজন সাহসী মার্কিন যোদ্ধাকে উদ্ধার করা সামরিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা উদ্ধার অভিযান।'
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ রবিবার তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে লেখেন, 'ঈশ্বর মহান।'
সংবাদমাধ্যম এক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ওই সেনা কর্মকর্তা বিমান থেকে ছিটকে পড়ার পর রেডিওতে প্রথম এই কথাটিই বলেছিলেন। তবে রাষ্ট্রীয় কাজে এভাবে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের বিষয়টিকে অনেক বিশেষজ্ঞই ভালো চোখে দেখছেন না।
ধর্ম ও যুদ্ধের নীতিকে মেলানোয় তোপের মুখে ট্রাম্প
ট্রাম্প ২০২৫ সালের শপথ অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ঈশ্বরই তাকে এক গুপ্তঘাতকের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনি তখন বলেছিলেন, 'আমি তখনই অনুভব করেছি এবং এখন আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমার জীবন একটি বিশেষ কারণে রক্ষা পেয়েছে। ঈশ্বরই আমাকে বাঁচিয়েছেন যাতে আমি আবারও আমেরিকাকে মহান করতে পারি।'
তবে ধর্মীয় বিষয় ও সামরিক হুমকি একসাথে মেশানোর কারণে রবিবার কিছু সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জরি টেলর গ্রিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের খ্রিষ্টানদের উচিত ছিল 'যুদ্ধ না বাড়িয়ে শান্তি স্থাপনের' চেষ্টা করা।
তিনি যুক্তি দেন, যিশুর শিক্ষা সব সময় ক্ষমা এবং শত্রুর প্রতিও ভালোবাসার ওপর গুরুত্ব দেয়।
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) ট্রাম্পের এই ভাষার নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতিতে বলেছে, তার 'ইসলামকে উপহাস করা এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি' অত্যন্ত বেপরোয়া ও বিপজ্জনক। কেয়ার আরও বলেছে, হামলার হুমকির মাঝখানে অবহেলার সঙ্গে 'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য' বলা মুসলিম ও তাদের বিশ্বাসের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন এবং ধর্মীয় ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারেরই নামান্তর।
গত মাসে ৩০ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা পেন্টাগনের মহাপরিদর্শক (ইন্সপেক্টর জেনারেল) প্ল্যাট মরিং-কে একটি তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিছু প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ বাইবেলের 'শেষ জামানার ভবিষ্যদ্বাণীর' দোহাই দিয়ে ইরান যুদ্ধকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে।
ইন্সপেক্টর জেনারেলকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, 'যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে একটি স্বপ্রণোদিত যুদ্ধ চালাচ্ছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন ও কোটি কোটি ডলার ঝুঁকির মুখে, তখন গির্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যে কঠোর পৃথকীকরণ বজায় রাখা এবং সেনাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।'
চিঠিতে আরও বলা হয়, সামরিক অভিযানসমূহ কোনো ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী বা চরম বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্য ও আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা শিয়া ইসলামি আদর্শের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। তারা নিয়মিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে 'গ্রেট শয়তান' হিসেবে চিত্রায়িত করে এবং তাদের সামরিক প্রচারণায় নিয়মিত ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে নিহত যোদ্ধাদের 'শহীদ' হিসেবে অভিহিত করে।
