আনিসুল-সালমানদের ফাঁসি চেয়ে ট্রাইব্যুনালে শহীদ শাহরিয়ারের বাবার জবানবন্দি
জুলাই গণআন্দোলনে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। ছেলের মরদেহ নিয়ে গ্রামে ফেরার পথে পদে পদে বাধার শিকার হতে হয় পরিবারটিকে। এমনকি স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের বাধায় শেষ পর্যন্ত রাতের আঁধারে শাহরিয়ারের দাফন সম্পন্ন করতে বাধ্য হন স্বজনরা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ছেলের মর্মান্তিক বর্ণনা দিতে গিয়ে আজ বারবার অশ্রুসজল হয়ে পড়েন বাবা আবদুল মতিন। শাহরিয়ার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি দাবি করেছেন তিনি।
চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান চলাকালীন কারফিউ জারি করে গণহত্যায় উসকানি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আজ (৫ এপ্রিল) চতুর্থ দিনের মতো সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
এ মামলায় ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন শাহরিয়ারের বাবা আবদুল মতিন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে আবদুল মতিন বলেন, '২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বরের গোল চত্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল আমার ছেলে। সেখানেই ছেলেটা গুলিবিদ্ধ হয়। সহযোদ্ধারা তাকে প্রথমে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর আজমত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু গুরুতর হওয়ায় ওই দিনই শাহরিয়ারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা।'
ঘটনার দিন গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে অবস্থান করছিলেন আবদুল মতিন। মোবাইল ফোনে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে ভাগ্নে রিয়াদকে নিয়ে দ্রুত ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে রাত দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান।
ছেলের তখনকার অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেন, 'হাসপাতালে এসে শাহরিয়ারকে আইসিইউতে দেখি। তার কপালে গুলি লেগে মগজের ভেতরে ঢুকেছে বলে জানান চিকিৎসকরা। গুলি বেরও করেননি তারা। অপারেশন করতে সাহস পাননি। আমার অনুরোধে তারা সিটিস্ক্যান করেন। পরীক্ষার প্রতিবেদন এলে অপারেশন করা নিরাপদ হবে না বলে জানানো হয়। আমি অন্য জায়গায় চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানাই। এজন্য রিলিজ চাইলেও তারা দেননি।'
শাহরিয়ারের বাবা বলেন, '২০ জুলাই দুপুর ২টা ৬ মিনিটে আমার ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। লাশ নিয়ে যেতে চাইলে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তারা আমাকে থানায় যেতে বলেন। মিরপুর থানায় গেলে জিডি নেয়নি পুলিশ। ১৮ জুলাই ঢাকা শহরে সব জায়গাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকে মারা গেছেন বলে তারা আমাকে জানান। বলা হয়— 'আপনার ছেলে এই থানা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে তার কোনো প্রমাণ নেই।'
পরদিন ২১ জুলাই শাহবাগ থানায় জিডি নেওয়া হচ্ছে এমন খবর পেয়ে আবদুল মতিন সেখানে জিডি করেন। সেই জিডির কপি নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার পর শাহরিয়ারের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিন বলেন, 'ওই দিন রাত ৮টায় ছেলের লাশ আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশটি গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য। কিন্তু গ্রামে নিয়ে দাফনে নিষেধ করেন আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের লোকেরা। মোবাইল ফোনে তারা এ কথা জানান। আমি রাজি না হওয়ায় রাতের আঁধারে দাফন করতে বলা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় বাধার সম্মুখীন হই।' দীর্ঘ জটিলতা শেষে ২২ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় শাহরিয়ারকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ছেলের পরিচয় ও বিচার চেয়ে তিনি বলেন, 'শাহরিয়ার আমার একমাত্র ছেলে। সে ইশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজ থেকে ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল। ১০ জুলাই পাঁচটি পরীক্ষা দেওয়ার পর কয়েকদিন গ্যাপ থাকায় ভাটারা থানাধীন আমার ভাড়া বাসায় এসেছিল ছেলেটি। ১৬ জুলাই মিরপুরে তার খালার বাসায় বেড়াতে যায়। সেখান থেকে খালাতো ভাইসহ আন্দোলনে অংশ নেয় শাহরিয়ার। আমি আমার ছেলে হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার ফাঁসি চাই।'
সাক্ষী জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি জানতে পেরেছেন—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ অন্যদের কুপরামর্শে তার ছেলেসহ সারাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ দলীয় সভায় কারফিউ জারির আড়ালে আন্দোলনকারী ছাত্রদের নির্মূল করার কুপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
৫ আগস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামি আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের একটি কথোপকথন শুনতে পান বলেও জানান তিনি। যেখানে তারা বলেছিলেন—কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে নির্মূল তথা হত্যা করা হবে।
জবানবন্দি শেষে আবদুল মতিনকে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন।
