মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা: সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিচার শুরু
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন কারফিউ জারি করে গণহারে হত্যার উসকানি প্রদানসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এই বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এদিন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ প্রসিকিউশনের পক্ষে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কোনো সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় মামলার প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সূচনা বক্তব্য প্রদান শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, 'শপথ নিয়েও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রশ্রয় দিয়েছেন।'
চিফ প্রসিকিউটর আদালতে উল্লেখ করেন, 'এ মামলার প্রধান দুই আসামি হলেন সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হক। এর মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন সালমান। আর আইন রক্ষার শপথ নিয়েও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আইনি ও নীতিগত প্রশ্রয় দিয়েছেন সাবেক এই আইনমন্ত্রী।'
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে তিনি জানান, জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন দমনের নীলনকশা প্রণয়ন করেন এই দুই আসামি। সরকারের শীর্ষ মহলের সাথে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, দেখামাত্র গুলির (শুট অন সাইট) নির্দেশনা, হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ এবং গণগ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'জুলাই-আগস্টে হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, লক্ষ্যভিত্তিক ও ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত। এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় ক্যাডার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের ফল। এই অপরাধের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা। এই অপরাধ কেবল কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়নি; এটি একটি জাতির স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা প্রমাণাদির মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে এসব প্রমাণ করব৷'
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, 'রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ গোপন করে ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য প্রশাসনিকভাবে চাপ প্রয়োগ করেন আসামি সালমান এফ রহমান। বিশেষভাবে ১৯ জুলাই কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন আসামিদ্বয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণভবনে বৈঠক হয়। এরপর সেনা মোতায়েনসহ দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়, যা হত্যাযজ্ঞকে আরও ত্বরান্বিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ ও ২৮ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্টও হত্যাযজ্ঞ থামেনি।'
বক্তব্যের এক পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর মিরপুরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'হত্যাযজ্ঞের অংশ হিসেবে মিরপুরে সিফাত হাওলাদার, আখতারুজ্জামান, শাহরিয়ার আলভীসহ একের পর এক তরুণ প্রাণ হারান। শুধু ২০ জুলাই অন্তত ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।'
প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই মামলায় মোট ২৮ জন সাক্ষী উপস্থাপন করা হবে। সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন আহত ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষদর্শী, শহীদদের স্বজন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা। সাক্ষ্যের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ দালিলিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ, জব্দ তালিকা, আলামত, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং অপরাধের পদ্ধতিগত চরিত্র আদালতে অকাট্যভাবে প্রমাণ করা হবে।
চিফ প্রসিকিউটর শেষে বলেন, 'এই আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন শহীদদের আত্মা। আহতরা অপেক্ষা করছেন রাষ্ট্রীয় অপরাধের স্বীকৃতির। আর ট্রাইব্যুনালের ন্যায়বিচারের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা করছে গোটা জাতি।'
