খার্গ দ্বীপ দখল: যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য জয়ের চাবিকাঠি নাকি বড় ঝুঁকি?
পারস্য উপসাগরে, ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে অবস্থিত ছোট, পাথুরে একটি দ্বীপ খার্গ—যা ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা যুদ্ধে সম্ভাব্য জয়ের চাবিকাঠি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিপর্যয়ের কারণও হয়ে উঠতে পারে।
দ্বীপটি খুবই ছোট—আয়তনে প্রায় আট বর্গমাইলের কিছু কম। সেখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই তেল খাতে কর্মরত। একই সঙ্গে এটি ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ মার্চ খার্গ দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায় এবং এখন দ্বীপটি দখল অভিযানের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।
এই পরিকল্পনার পেছনে যুক্তি হলো—ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব তেলবাজারে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশ তেল রপ্তানি এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান নিজেদের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দিয়েছে এবং যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেল সরবরাহে বড় বাধার মুখে পড়েছে, ফলে তেলের দাম বাড়ায় ইরানের আয়ও বেড়েছে।
এছাড়া, ইরান আরব উপদ্বীপের এমন পাইপলাইনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহন করে। পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরানপন্থী হুথি গোষ্ঠীর কাছে বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতাও রয়েছে, যা সুয়েজ খাল দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। লোহিত সাগর ও আদেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই প্রণালি বন্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ ইরানি অবরোধের মুখে পড়বে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে পারে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল, এতে ইরানের নিজের তেল রপ্তানিও বন্ধ হয়ে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে এবং সম্ভবত শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরান এখনো তেল রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের দুর্বল অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
ইরানের কৌশলগত ধারণা হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা তারা যতদিন সহ্য করতে পারবে, তার চেয়ে কম সময় যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোসহ যেসব দেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা পর্যাপ্ত ক্ষতির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ শেষ করতে চাপ দিতে পারে—এমনকি ইরানের জন্য তুলনামূলক অনুকূল শর্তেও। গ্যাস ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ট্রাম্প প্রশাসনকে সংঘাত শেষ করার জন্য চাপে রাখবে।
কিন্তু, ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির হাতিয়ার পাবে এবং ইরানের এই কৌশল ভেঙে দিতে পারবে। তেল রপ্তানি করতে না পারলে ইরানও একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে, যেটি তারা বর্তমানে অন্যদের ওপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমান হামলা চালিয়ে যেতে পারবে, যতক্ষণ না ইরান যুদ্ধ শেষ করতে আমেরিকার শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।
এ কারণেই গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র জাপান থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ইউনিটটি ইউএসএস ট্রিপোলি নামের অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট জাহাজ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এখানে প্রায় ২,২০০ থেকে ২,৫০০ মেরিন বা নৌসেনা রয়েছে। এত বড় বাহিনী স্থানান্তর সাধারণ ঘটনা নয়, এবং বাহিনীর আকার দেখে মনে করা হচ্ছে খার্গ দ্বীপকে কেন্দ্র করে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনা আছে।
খার্গে আক্রমণের আগে দ্বীপে থাকা বাকি সামরিক স্থাপনা এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে সম্ভাব্য হুমকিগুলো বিমান হামলার মাধ্যমে ধ্বংস করা হতে পারে। পারস্য উপসাগর এখনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়, ট্রিপোলি দূরেই অবস্থান করবে, কিন্তু জাহাজে থাকা এমভি-২২ অসপ্রে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মেরিনদের দ্বীপে নামানো হতে পারে। প্রথম লক্ষ্য হবে দ্বীপে ইরানি সৈন্য ও ভারী সরঞ্জাম আনার সক্ষমতা নষ্ট করা—যেমন খার্গ বিমানবন্দরের প্রায় ৫,৯২২ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে দখল করা। ইরানি সেনাদের প্রতিরোধ দ্রুত দমন করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বিমানশক্তি এখানে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
খার্গ দ্বীপ দখল করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু তা ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ইরান কুয়েত যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হুসেইন-এর মতো তেল স্থাপনাগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, যা দ্বীপের পরিবেশ দূষিত করবে এবং মার্কিন সেনাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। ছোট এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের আগুন মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সীমিত থাকবে এবং সৈন্যদের সরে যাওয়ার সুযোগও কম থাকবে।
এমনকি এসব কৌশল ছাড়া শুধু ভৌগোলিক অবস্থানও— মার্কিন বাহিনীর জন্য খার্গ ধরে রাখা কঠিন করে তুলবে। একটি এক্সপেডিশনারি ইউনিট সাধারণত ১৫ দিনের বেশি সরবরাহ ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। খার্গ কুয়েত সিটি থেকে প্রায় ১৪০ মাইল দূরে হলেও ইরানের উপকূলের খুব কাছাকাছি। ফলে সরবরাহ জাহাজগুলো ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট ছোট নৌযানের বহর— বিশেষত ড্রোনচালিত নৌযানের আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবে।
আকাশপথেও মার্কিন সেনাদের রসদ সরবরাহ করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। খার্গের দূরত্বের কারণে সেখানে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা মোতায়েন কঠিন হবে। মেরিনদের বহনযোগ্য ম্যানপ্যাডস ও যুদ্ধবিমানের টহল— ড্রোন ঠেকাতে পারলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারবে না। ইরান স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রানওয়ে ধ্বংস করতে পারে, ফলে দ্বীপে কার্গো বিমান নামা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তেল স্থাপনায় আগুন লাগলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি হুমকি উঠে এসেছে—লয়টারিং মিউনিশন বা লক্ষ্যবস্তুর ওপর আকাশে চক্কর দিতে দিতে অপেক্ষা করতে পারে এমন আত্মঘাতী ড্রোন। এই ধরনের মিউনিশন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য শনাক্ত করার পরেই আঘাত হানে। রাশিয়ার ব্যবহৃত 'ল্যানসেট' ড্রোনের মতো কম খরচের এই অস্ত্র ইরানও ব্যবহার করতে পারে। এগুলো সরবরাহ জাহাজ, বিমান বা সৈন্যদের সহজ লক্ষ্য বানাতে পারে। ইউক্রেন এসব ড্রোন ঠেকাতে সেনা ও রসদ চলাচলের রাস্তার ওপর জাল টানতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৪ সালে ইরানও ল্যানসেটের নিজস্ব সংস্করণ উন্মোচন করেছে। যদি বাস্তবেই এই ড্রোন ইরানের হাতে থাকে, তাহলে খার্গ দ্বীপে দখলদার মার্কিন সেনাদের জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দখল করলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে পড়ে সরবরাহ সংকটে ভুগতে পারে। এতে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হতে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত "শক অ্যান্ড অ" কৌশল থেকে ভিন্ন। ইরান ইতোমধ্যে কাতার ও সৌদি আরবে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে সংঘাত বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এতে হতাহত ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি বাড়লে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর সেনা প্রত্যাহারের চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ড্রোনের হুমকির মধ্যে সেনা সরিয়ে নেওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সফলভাবে খার্গ দখল করে ধরে রাখতে পারে, তাহলে ইরান তেল রপ্তানির প্রধান পথ হারাবে এবং তেহরানের জন্য যুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে তারা দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাওয়ার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য হতে পারে।
এটি ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ ধরনের অভিযান কখনো চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। শত্রু দেশের ভূখণ্ড দখল করে তা ধরে রাখার মতো অভিযানে ঝুঁকি অনেক বেশি—এবং ইরান নিশ্চিতভাবেই এর জবাবে আরও বড় মাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
