তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট।
২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্বলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পর চারটি পৃথক রিভিউ আবেদনের প্রেক্ষিতে, গত বছরের ২০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে রায় ঘোষণা করেন।
আজ রোববার (১৫ মার্চ) ৭৪ পৃষ্ঠার সেই পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১১ সালে বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায়ে আরো দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিলেও, পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই পর্যবেক্ষণ রাখা হয়নি। যার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনে।
ওই বেঞ্চের সংক্ষিপ রায়ে একরকম পর্যবেক্ষণ, আবার পূর্ণাঙ্গ রায়ে অরেক রকম—এবিষয়ে রোববার প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, "আদালত এই মর্মে মত পোষণ করে যে সংক্ষিপ্ত আদেশ ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা রেকর্ডে প্রতীয়মান একটি ত্রুটি। একই সঙ্গে আদালত মনে করে যে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এর সাংবিধানিক ম্যান্ডেটের মধ্যে সৎ উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল; যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হলে ডকট্রিন অব নেসেসিটি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের অস্থায়ী সুরক্ষা হিসেবে বৈধতা দেয়; এবং এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কোনোভাবেই ধ্বংস হয়নি, বরং সংরক্ষিত হয়েছে।"
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ বলেন, চতুর্দশ নির্বাচন থেকেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। তবে বর্তমান সংসদ চাইলে এই ব্যবস্থার সংযোজন কিংবা বিয়োজন করতে পারবে বলে জানান এই মামলার আইনজীবীরা।
বহুল আলোচিত এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান।
আইনজীবীরা বলেছেন, রায় অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হবেন। তিনি রাজি না থাকলে, তার আগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং এরপর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের মধ্য থেকে ক্রমানুসারে নিয়োগ দেওয়া হবে। যদি কোনো বিচারপতি উপলব্ধ না থাকেন, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন।
প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শে রাষ্ট্রপতি ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন, যারা নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হবেন। নতুন সংসদ গঠিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই সরকার দায়িত্ব পালন করবে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের আন্দোলনের চাপে তৎকালীন বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে। পরে ১৯৯৮ সালে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়। ২০০৪ সালে রিট খারিজ হলে এ ব্যবস্থা বহাল থাকে।
২০০৫ সালে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে ২০১০ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হয়। তখন অ্যামিকাস কিউরিসহ সবাই কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এর পক্ষে ছিলেন।
২০১১ সালের ১০ মে সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫৫টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং ৩ জুলাই তা অনুমোদন পায়।
