মধুপুরে গারো পরিবার হেনস্তা: অভিযুক্ত আনসারদের বদলির সুপারিশ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের আশ্বাস
টাঙ্গাইলের মধুপুরে চাঁদপুর রাবার বাগান এলাকায় শটগান দিয়ে গুলি করার ভয় দেখিয়ে একটি দরিদ্র গারো পরিবারের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় রাবার বাগানের আনসার সদস্যদের হাতে এক গারো নারী হেনস্তার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, মধুপুর উপজেলার চাঁদপুর রাবার বাগানের কালাপাহাড় এলাকায় শিবলী মাংসাং নামের এক ভূমিহীন গারো নারী প্রায় পাঁচ বছর আগে বাড়িঘর তুলে তার ১১ সন্তানসহ বসবাস শুরু করেন। ভাঙাচোরা একটি ছোট ঘরে পরিবারের ১৩ সদস্যের থাকা কষ্টকর হওয়ায় তিন দিন আগে তিনি একটি দুইচালা ঘর তোলেন।
খবর পেয়ে বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থার ফিল্ড অফিসার বিজন কুমার সশস্ত্র আনসার সদস্যসহ ২০–২৫ জন কর্মী নিয়ে সোমবার ওই বাড়িতে যান। অভিযোগ রয়েছে, তারা নতুন করে তোলা ঘরের ছাউনি ও খুঁটি ভেঙে ফেলেন এবং পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ ও ভয়ভীতি দেখান। এ সময় বাড়ির ফলদ গাছও কেটে ফেলা হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাড়ির কর্ত্রী শিবলী মাংসাং বাধা দিতে গেলে আনসার সদস্যরা তার কাপড় ধরে টানাটানি করেন। এক আনসার সদস্য তাকে লক্ষ্য করে শটগান তাক করেন। পরে অন্যরা সংযত হওয়ার ইঙ্গিত দিলে তিনি গুলি করা থেকে বিরত থাকেন। এ সময় শিবলী মাংসাংকে বাচ্চাসহ ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়।
শিবলীর স্বামী রুমেন কুবি বলেন, চাঁদপুর রাবার বাগানের অনেক জমি প্রভাবশালীরা জবরদখল করে আনারস ও কলার চাষ করছেন এবং বাড়িঘর তুলেছেন। কিন্তু তাদের উচ্ছেদ করা না হলেও একটি অসহায় পরিবারের ঘর ভেঙে গুলি করার ভয় দেখানো হয়েছে। তিনি এর প্রতিকার দাবি করেন।
চাঁদপুর রাবার বাগানের আনসার ক্যাম্পের সদস্যরা জানান, উত্তেজনার মুহূর্তে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে। ভয় দেখানোর জন্য শটগান তাক করা হয়েছিল।
বাগানের ম্যানেজার আমান উল্লাহ আমান বলেন, বাগানের জমিতে নতুন করে ঘর তোলায় বাধা দেওয়া হয়েছে। কাউকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্য ছিল না।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে মঙ্গলবার মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মধুপুর থানার ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের উপস্থিতিতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালীদের দখলে থাকা জমি উদ্ধার করতে না পারলেও দরিদ্র গারো পরিবারকে উচ্ছেদ করতে যাওয়ায় এলাকায় নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এতে মধুপুর অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
ভুক্তভোগী রুমেন কুবি জানান, বসতবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার জন্য বনবিভাগ থেকে তাদের কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়নি।
বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থা মধুপুর জোনের মহাব্যবস্থাপক ইসমাইল হোসেন বলেন, 'এটি দুঃখজনক ঘটনা। দরিদ্র পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ ঠিক হয়নি। আনসার সদস্যরা বাড়াবাড়ি করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গারো পরিবারটি যাতে ওই বাড়িতে থাকতে পারে সে বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে।'
মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মির্জা জুবায়ের হোসেন জানান, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পুনর্বাসনের জন্য ঘর পুনর্নির্মাণে দুই বান্ডিল টিন, ছয় হাজার টাকা এবং খুঁটির সব ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বেপরোয়া আচরণের অভিযোগে বাগানের আনসার টিমকে বদলির সুপারিশ করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টির সমাধানের সময় জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের নেতারা ও স্থানীয় সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
