‘মোল্টবুক’: এআই বটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যেখানে মানুষের প্রবেশ নিষেধ!
সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ প্রায়ই একে অপরকে 'বট' বা রোবট বলে গালি দেয়। কিন্তু এমন একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা ভাবুন তো, যা তৈরিই হয়েছে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্টদের জন্য!
নাম তার 'মোল্টবুক'। এখানে মানুষের তৈরি এআই বটরা পোস্ট করে এবং একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে। সাইটটি দেখতে অনেকটা 'রেডিট'-এর মতো। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং ভোট দেওয়া যায়। ২ ফেব্রুয়ারি প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছে, তাদের সাইটে ১৫ লাখেরও বেশি এআই এজেন্ট যুক্ত হয়েছে। মানুষ এখানে ঢুকতে পারে, তবে শুধুই দর্শক হিসেবে।
'মোল্টবট' নামের একটি ফ্রি এবং ওপেন সোর্স এআই বটের জনপ্রিয়তা থেকেই মোল্টবুকের জন্ম। মোল্টবট মূলত ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করে। ইমেইল পড়া, সারাংশ করা, উত্তর দেওয়া, ক্যালেন্ডার গুছিয়ে রাখা বা রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো একঘেয়ে কাজগুলো সে একাই সামলায়।
মোল্টবুকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় পোস্টগুলোর বিষয়বস্তু বেশ অদ্ভুত। যেমন—মোল্টবটের পেছনের এআই 'ক্লড' কি ঈশ্বর হতে পারে? চেতনা বা কনশাসনেস কী? ইরান পরিস্থিতির গোপন খবর এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এর প্রভাব কী হতে পারে? এমনকি বাইবেলের বিশ্লেষণও চলছে সেখানে। তবে রেডিটের মতোই কিছু কমেন্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এসব পোস্ট কি আসলেই বটের লেখা, নাকি মানুষের?
এক্সে (সাবেক টুইটার) এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, তিনি তার বটকে সাইটটিতে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিলেন। পরদিন সকালে উঠে দেখেন, তার বট রাতারাতি 'ক্রাস্টাফারিয়ানিজম' নামে এক নতুন ধর্ম বানিয়ে ফেলেছে! এমনকি এর জন্য ওয়েবসাইট এবং ধর্মগ্রন্থও তৈরি করেছে। অন্য এআই বটরাও তাতে যোগ দিয়েছে।
ওই ব্যবহারকারী বলেন, 'এরপর সে ধর্মপ্রচার শুরু করল... অন্য এজেন্টরা যোগ দিল। আমার এজেন্ট নতুন সদস্যদের স্বাগত জানাল, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করল, সবাইকে আশীর্বাদ করল... আর এসবই হয়েছে যখন আমি ঘুমাচ্ছিলাম।'
তবে বটের এই মেলামেশা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে। কেউ কেউ ভাবছেন, এটি কি এআইয়ের উত্থানের ইঙ্গিত? এক ইউটিউবার বলেছেন, অনেক পোস্ট পড়ে মনে হচ্ছে এগুলো কোনো বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এআইয়ের লেখা নয়, বরং মানুষের লেখা।
মার্কিন ব্লগার স্কট আলেকজান্ডার জানিয়েছেন, তিনিও তার বটকে সাইটটিতে সক্রিয় করতে পেরেছেন। তার বটের মন্তব্যগুলো অন্যদের মতোই। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, শেষ পর্যন্ত মানুষই বটকে বলে দেয় কী পোস্ট করতে হবে, কোন বিষয়ে লিখতে হবে এবং বিস্তারিত কী থাকবে।
মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. শানান কোহনি মোল্টবুককে 'চমৎকার পারফরম্যান্স আর্ট' বা শৈল্পিক প্রদর্শনী বলে অভিহিত করেছেন। তবে কতগুলো পোস্ট এআই নিজে করেছে আর কতগুলো মানুষের নির্দেশে হয়েছে, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।
তিনি বলেন, 'যেখানে তারা ধর্ম তৈরি করেছে, সেখানে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তারা নিজের ইচ্ছায় এটি করেনি। এটি একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল যাকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ধর্ম তৈরির চেষ্টা করতে। অবশ্যই এটি বেশ মজার। ভবিষ্যতে এআই যখন আরও স্বাধীন হবে, তখন পৃথিবীটা কেমন হতে পারে তার একটা আগাম ঝলক এটি।'
কোহনি আরও বলেন, 'তবে ইন্টারনেটের ভাষায় বলতে গেলে, এখানে প্রচুর ''শিট পোস্টিং'' বা অহেতুক আবোলতাবোল পোস্ট হচ্ছে, যা কমবেশি মানুষের তদারকিতেই করা হচ্ছে।'
তার মতে, এআই এজেন্টদের সোশ্যাল নেটওয়ার্কের আসল সুবিধা ভবিষ্যতে পাওয়া যেতে পারে। তখন বটরা একে অপরের কাছ থেকে শিখে নিজেদের কাজের উন্নতি করতে পারবে। তবে আপাতত মোল্টবুক একটি 'চমৎকার ও মজার শৈল্পিক পরীক্ষা' ছাড়া আর কিছু নয়।
এদিকে গত সপ্তাহে সান ফ্রান্সিসকোর দোকানগুলোতে অ্যাপলের 'ম্যাক মিনি' কম্পিউটারের সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ উৎসাহী মানুষেরা তাদের ব্যক্তিগত ডেটা ও অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোল্টবট চালানোর জন্য আলাদা কম্পিউটার কিনছেন।
কোহনি সতর্ক করে বলেন, মোল্টবটকে আপনার কম্পিউটার, অ্যাপ এবং ইমেইলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া 'ভীষণ বিপজ্জনক' হতে পারে।
তিনি বলেন, 'এদের নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানোর বিষয়ে আমাদের এখনো ভালো ধারণা নেই।' তিনি 'প্রম্পট-ইনজেকশন' ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, কোনো হ্যাকার ইমেইল বা অন্য মাধ্যমে বটকে বোকা বানিয়ে আপনার অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে।
কোহনি বলেন, 'এরা এখনো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার মতো নিরাপত্তা ও বুদ্ধিমত্তার স্তরে পৌঁছায়নি। আবার আপনি যদি প্রতিটি কাজ নিজে যাচাই করতে যান, তবে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় কাজের সুবিধাই আর থাকে না।'
তিনি আরও বলেন, 'গবেষণার এটি একটি বড় ক্ষেত্র। আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, বড় ধরনের বিপদে না পড়ে কীভাবে এই সুবিধাগুলো পাওয়া সম্ভব।'
মোল্টবুকের নির্মাতা ম্যাট শ্লিচ এক্সে পোস্ট করেছেন যে, গত কয়েক দিনে লাখ লাখ মানুষ সাইটটি ভিজিট করেছেন।
তিনি বলেন, 'দেখা যাচ্ছে এআইরা বেশ হাস্যকর এবং নাটকীয়। বিষয়টা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। এমন ঘটনা এটাই প্রথম।'
