যুক্তরাজ্যের ৯৯ বছরের পুরোনো ভারতীয় রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার উপক্রম, রাজা চার্লসের হস্তক্ষেপ কামনা
যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম ভারতীয় রেস্তোরাঁ 'ভিরাসোয়ামী' বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তা রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছেন সমর্থকেরা। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা বাকিংহাম প্যালেসে একটি পিটিশন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে তারা রাজা তৃতীয় চার্লসের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ভিরাসোয়ামী লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটে নিজস্ব অবস্থানে প্রায় এক শতাব্দী ধরে টিকে আছে। তবে জমির মালিক ক্রাউন এস্টেটের সঙ্গে বিরোধের কারণে রেস্তোরাঁটির লিজ নবায়ন না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক এই রেস্তোরাঁটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
রাজা চার্লস বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে বরাবরই সোচ্চার। সে কারণে ভিরাসোয়ামীর সমর্থকেরা রেস্তোরাঁটিকে 'অংশীদারিত্বমূলক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ' হিসেবে উল্লেখ করে তা রক্ষায় রাজার সমর্থন চাইছেন।
তবে ক্রাউন এস্টেট জানিয়েছে, ভবনটির এমন সংস্কার প্রয়োজন, যা রেস্তোরাঁটি রেখে করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে ক্রাউন এস্টেটের একজন মুখপাত্র বলেন, 'লিজ নবায়ন না করা এবং বর্তমান জায়গা থেকে রেস্তোরাঁটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা হালকাভাবে নেইনি।' ক্রাউন এস্টেট একটি স্বাধীন সম্পত্তি কোম্পানি, যার লভ্যাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমা হামলা বা ব্লিটজ চলাকালেও খাবার পরিবেশন চালু রেখেছিল ভিরাসোয়ামী। সেই ইতিহাস সামনে রেখে রেস্তোরাঁটিকে বাঁচাতে শুরু হওয়া পিটিশনে ইতোমধ্যে ১৮ হাজারের বেশি মানুষ সই করেছেন।
রেমন্ড ব্ল্যাঙ্ক, মিশেল রক্স এবং রিচার্ড করিগানের মতো খ্যাতনামা শেফরাও এই মিশেলিন-তারকাযুক্ত রেস্তোরাঁটি বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। শেফ রিচার্ড করিগান বলেন, 'ইউরোপের অধিকাংশ শহর তাদের কিংবদন্তিতুল্য রেস্তোরাঁগুলোকে লালন করে। ঈশ্বরের দোহাই, আমরা কেন ভিরাস্বামীকে হারাতে চাইব?'
আগামী মার্চ মাসে ভিরাসোয়ামীর ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। পিটিশনে রাজা চার্লসকে একটি 'ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা' এবং 'ইন্দো-ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক' বাঁচানোর প্রচারণায় সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সমর্থক ও শেফরা মিলে এই পিটিশন বাকিংহাম প্যালেসের গেটে পৌঁছে দেবেন। পাশাপাশি মার্চ মাসে একটি শতবর্ষী ভোজের আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে তারকা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে রেস্তোরাঁটির প্রতি সমর্থন জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সোহো সোসাইটির চেয়ারম্যান লুসি হেইন এলাকাটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রক্ষায় প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি 'ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লন্ডনের এই আইকনিক রেস্তোরাঁটি চালু রাখার লড়াইকে' সমর্থন করছেন। তার ভাষায়, রেস্তোরাঁটি বন্ধ হলে তা হবে 'লন্ডনের ইতিহাস ও রন্ধন ঐতিহ্যের জন্য এক বিশাল ক্ষতি'। সোসাইটির দাবি, ভিরাসোয়ামীকে 'কমিউনিটি ভ্যালু অ্যাসেট' [সম্প্রদায়ের জন্য মূল্যবান সম্পদ] হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় রেস্তোরাঁ সাধারণ বিষয় হলেও, ভিরাসোয়ামী চালু হওয়ার সময় এটি ছিল পথিকৃৎ। শুরুতে এটি লন্ডনে বসবাসকারী অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের আকর্ষণ করত, যারা ভারতের খাবারের স্বাদ পেতে চাইতেন।
রেস্তোরাঁটির সহ-মালিক রঞ্জিত মাথরানি বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত জেনারেল, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে এখানে আসতেন। মহাত্মা গান্ধী এবং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও ভিরাসোয়ামীর গ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে এটি ওয়েস্ট এন্ডের একটি অভিজাত গন্তব্যে পরিণত হয়। চার্লি চ্যাপলিন, মারলন ব্র্যান্ডো এবং স্যার উইনস্টন চার্চিলের মতো ব্যক্তিত্ব এখানে এসেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রিন্সেস অ্যান, ডেভিড ক্যামেরন ও অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবারও রেস্তোরাঁটিতে খাবার খেয়েছেন।
ভিরাসোয়ামীর সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেসের যোগাযোগ আগেও ছিল। ২০০৮ ও ২০১৭ সালে গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় অতিথিদের জন্য রেস্তোরাঁটির শেফরা খাবার সরবরাহ করেছিলেন।
রেস্তোরাঁটি ব্রিটিশদের জনপ্রিয় কারি ও বিয়ারের জুটির জন্মস্থান বলেও দাবি করে। ১৯২০-এর দশকে ডেনমার্কের প্রিন্স অ্যাক্সেল এখানে কার্লসবার্গ পান করতে পছন্দ করতেন। সেখান থেকেই এই রন্ধন সম্পর্কের সূচনা।
রঞ্জিত মাথরানি বলেন, ভিরাস্বামী ব্রিটেনে ভারতীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় রেস্তোরাঁগুলোর জন্য পথপ্রদর্শক ছিল। তার মতে, এটি গ্রাহকদের জীবনে একটি 'গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা' পালন করেছে।
তিনি বলেন, 'মানুষ এসে বলে—আমি ১২ বছর বয়সে আমার গডফাদারের সঙ্গে প্রথম এখানে এসেছিলাম, অথবা ব্লিটজের সময় এখানে আমার বাগদান হয়েছিল, কিংবা ১৯৫০-এর দশকে আমার চাচা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন।'
সহ-মালিক আশা করছেন, রাজা হয়তো রেস্তোরাঁটির সমর্থনে 'নিভৃতে কিছু বলবেন'। তবে বাকিংহাম প্যালেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি ক্রাউন এস্টেটের এখতিয়ারভুক্ত।
ভিরাসোয়ামী ব্রিটেন ও ভারতীয় খাবারের মেলবন্ধনের একটি জীবন্ত সাক্ষী। ১৯৪৭ সালের একটি মেনুতে 'মাদ্রাজ চিকেন কারি', 'তরকারি কা সালান' এবং 'খরগোশ কা সালান'-এর মতো 'ভারতীয় খাবার' বিক্রি করা হতো। এর সঙ্গে ৩ পাউন্ডে ১৯৩৪ সালের ভিউভ ক্লিকোট শ্যাম্পেনও পাওয়া যেত।
১৯৫২ সালের মধ্যে মেনুতে যুক্ত হয় চিকেন কোরমা, চিকেন ভিন্দালু, 'টিক্কা কাবাব' ও পাপড়। ১৯৫৯ সালে ভিরাসোয়ামী যুক্তরাজ্যে প্রথম তন্দুর ওভেন চালু করে। সে সময় তন্দুরি চিকেনের দাম ছিল বর্তমান মূল্যে প্রায় ৫২ পেনি। ২০১৬ সালে ৯০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রেস্তোরাঁটি মিশেলিন তারকা অর্জন করে।
পিকাডিলি সার্কাসের কাছে রিজেন্ট স্ট্রিটের 'ভিক্টরি হাউস' নামের গ্রেড–২ তালিকাভুক্ত ভবনটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কারণেই ক্রাউন এস্টেটের সঙ্গে ভিরাসোয়ামীর এই বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। পরিকল্পনা নথিতে দেখা যায়, রেস্তোরাঁটির জায়গা অফিস কক্ষে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে এবং প্রবেশপথ এমনভাবে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যাতে সেখানে রেস্তোরাঁ পরিচালনা করা সম্ভব না হয়।
ক্রাউন এস্টেটের মুখপাত্র বলেন, ভিরাসোয়ামীর জন্য পরিস্থিতিটি যে 'হতাশাজনক', তা তারা বোঝেন। এ কারণে ওয়েস্ট এন্ডে বিকল্প জায়গা খোঁজার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, 'আধুনিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এবং ভবনটি পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য ভিক্টরি হাউসের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।' তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত এমন কোনো বিকল্প প্রস্তাব আসেনি, যা 'জনগণের অর্থ ব্যবস্থাপনায় আমাদের দায়িত্বের' সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কোনো সমঝোতা না হলে লিজ নবায়ন না করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রেস্তোরাঁটি আগামী গ্রীষ্মের শেষ দিকে আদালতের দ্বারস্থ হবে।
এর আগে লন্ডনের আরেকটি ঐতিহাসিক ভারতীয় ডাইনিং প্রতিষ্ঠান 'ইন্ডিয়া ক্লাব' বাঁচানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ২০২৩ সালে ভবন পুনর্নির্মাণের জন্য সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ভিরাসোয়ামীর ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে ভিরাসোয়ামীর সহ-মালিক এখনো মনে করেন, রেস্তোরাঁটি টিকিয়ে রাখতে সমঝোতার পথ খোলা রয়েছে। মাথরানি বলেন, এই অবস্থানটি একটি 'অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতার অনুভূতি' দেয়। তার মতে, ওয়েস্ট এন্ডের এই ব্যস্ত কোণ থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকা রেস্তোরাঁটি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা 'সাংস্কৃতিক অসংবেদনশীলতা'র পরিচয়।
তিনি বলেন, 'আমাদের এখানেই থাকা উচিত।'
