সীতাকুণ্ডে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের এক সদস্য নিহত, আহত ৩
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য আহত হয়েছেন।
আজ ১৯ জানুয়ারি (সোমবার) বিকেলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম র্যাব ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল টিবিএসকে জানান, বিকেলে র্যাবের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গেলে একদল দুর্বৃত্ত তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
তিনি বলেন, 'হামলায় র্যাবের এক সদস্য গুরুতর আহত হন এবং বেশ কয়েকজন সদস্যকে হামলাকারীরা অবরুদ্ধ করে রাখে। আহত সদস্যকে দ্রুত সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।'
তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং অবরুদ্ধ সদস্যদের উদ্ধারসহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যৌথ অভিযান শুরু করেন।
দুর্গম জঙ্গল সলিমপুর: অপরাধীদের অভয়ারণ্য
সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। গত চার দশকে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে সেখানে হাজার হাজার অবৈধ বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এলাকাটি ভূমিদস্যু, সশস্ত্র অপরাধী এবং সংঘবদ্ধ চক্রের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসনের সূত্রমতে, সংলগ্ন লিংক রোডের পাশের জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রতি শতক ৯-১০ লাখ টাকা। সেই হিসেবে দখলকৃত এই সরকারি জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। কর্মকর্তাদের মতে, এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে।
সাম্প্রতিক অস্থিরতা
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘাত আরও তীব্রতর হয়েছে। পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অতি সম্প্রতি দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হন। এর পরদিন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ওই এলাকায় দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বারবার হামলা
জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান কিংবা পাহাড় কাটা বন্ধ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার হামলার শিকার হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান থেকে ফেরার পথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই এলাকায় অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। নিরাপত্তা বাহিনীর যানবাহন ঢোকার সাথে সাথেই অপরাধীদের নিজস্ব 'লুকআউট' বা নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা আগাম সতর্কবার্তা পেয়ে যায়। এরপর হামলাকারীরা উঁচু পাহাড় থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও ইটপাটকেল ছুড়ে আক্রমণ চালায়, যার ফলে এককভাবে অভিযান পরিচালনা করা দুষ্কর হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি জমিতে কারাগার ও আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও দখলকৃত জমি উদ্ধার করতে না পারায় কোনো প্রকল্পের কাজই এগোয়নি।
