জাতীয় নির্বাচনে মোতায়েন হচ্ছে ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য, থাকছে ৪১৮ ড্রোন ও সিসিটিভি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই নির্বাচনে সারাদেশে ৯টি বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনা; সবকিছুর সমন্বয় থাকবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনে।
রোববার (১৯ জানুয়ারি) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
দুই পর্বে মোতায়েন ও বিশেষ সেল
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই পর্বে বাহিনী মোতায়েন করা হবে। বর্তমানে যারা মোতায়েন রয়েছেন, প্রথম পর্বে তাদের কার্যক্রম বলবৎ থাকবে। দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক মোতায়েন শুরু হবে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে, যা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭ দিন স্থায়ী হবে।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে একটি 'আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল' গঠন করা হবে। এই সেলে প্রতিটি বাহিনীর একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অনুরূপ সমন্বয় সেল কাজ করবে।
বাহিনীভিত্তিক সদস্য সংখ্যা
নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, মোতায়েনকৃত সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১,০০,০০০ জন; বাংলাদেশ পুলিশ ১,৪৯,৪৪৩ জন; বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫,৭৬,৩১৪ জন; বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭,৪৫৩ জন; বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী ৫,০০০ জন; বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ৩,৭৩০ জন (স্থলভাগে ১,২৫০ জন); র্যাব ৭,৭০০ জন; বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ৩,৫৮৫ জন এবং সাপোর্ট সার্ভিস (ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স) ১৩,৩৯০ জন।
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও ড্রোনের ব্যবহার
এবারের নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন তদারকিতে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ২০০টি, বিজিবি ১০০টি, পুলিশ ৫০টি এবং অন্যান্য বাহিনী বাকি ড্রোনগুলো পরিচালনা করবে।
এছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের পোশাকে থাকবে ২৫ হাজার 'বডি ওর্ন ক্যামেরা'। এছাড়া, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত 'নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬' এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোটকেন্দ্রের বিন্যাস ও প্রশিক্ষণ
সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২,৭৬১টি। এর মধ্যে ৮,৭৮০টি কেন্দ্রকে 'অধিক গুরুত্বপূর্ণ', ১৬,৫৪৮টি কেন্দ্রকে 'গুরুত্বপূর্ণ' এবং ১৭,৪৩৩টি কেন্দ্রকে 'সাধারণ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বাচনি প্রশিক্ষণ আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হবে। এবারই প্রথম নির্বাচনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।
জরুরি সেবা ও দুর্গম এলাকা
জরুরি পরিষেবা নম্বর ৯৯৯-এ বিশেষ টিম গঠন করে সমন্বয় সেলের সাথে যুক্ত করা হবে। দুর্গম চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সামগ্রী এবং কর্মকর্তাদের পরিবহনের জন্য বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হবে। নিরাপত্তার খাতিরে এসব এলাকায় চার দিন আগে থেকে নিবিড় টহল পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অপারেশন ডেভিল হান্ট
শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেশজুড়ে চলমান 'অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২' এর অগ্রগতি সম্পর্কে উপদেষ্টা জানান, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৯,৮৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই অভিযানে ৩৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মামলা ও ওয়ারেন্টমূলে আরও ৩৩,৫১৩ জনসহ সর্বমোট ৫৩,৩৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চেকপোস্ট ও টহলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।'
