দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পরই জাপানে আগাম নির্বাচনের ডাক দিলেন তাকাইচি
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী শুক্রবার পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে একটি আগাম নির্বাচনের পথ সুগম হবে। তাকাইচি আশা করছেন, তার বিপুল ব্যক্তিগত জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে নিম্নকক্ষে বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবেন।
টোকিওতে এক সংবাদ সম্মেলনে তাকাইচি বলেন, এটি একটি 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত' যা 'জনগণকে সাথে নিয়ে জাপানের গতিপথ নির্ধারণ করবে।'
জাপানের প্রথম নারী নেত্রী ও তার মন্ত্রিসভা গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিপুল জনসমর্থন উপভোগ করছেন। কিন্তু তার দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জনমত জরিপে পিছিয়ে আছে, যা এই পদক্ষেপকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এটি জাপানে গত দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ভোটারদের প্রধান চিন্তার বিষয়, তখন সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার যে পরিকল্পনা তাকাইচি নিয়েছেন, এই নির্বাচন হবে মূলত তারই পরীক্ষা।
গত ২১ অক্টোবর আইনপ্রণেতাদের ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তাকাইচি এখন জাপানের সবচেয়ে শক্তিশালী কক্ষ 'হাউজ অফ রিপ্রেন্টেটিভস'-এ জনগণের ম্যান্ডেট চাইছেন। দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকেই তিনি 'অনবরত এই চিন্তায় ছিলেন যে, তাকাইচি মন্ত্রিসভা এখনও এমন কোনো নির্বাচনে পরীক্ষিত হয়নি যেখানে জনগণ সরাসরি সরকার নির্বাচন করে।'
সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রশ্ন রাখেন, 'সানায়ে তাকাইচি কি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য? আমি সার্বভৌম জনগণের কাছে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য বলতে চাই।'
জাপানের নিম্নকক্ষের ৪৬৫ জন এমপি নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে আগামী ২৭ জানুয়ারি। তাকাইচির দল এলডিপি ১৯৫৫ সাল থেকে প্রায় একটানা জাপান শাসন করছে। বর্তমানে নিম্নকক্ষে স্বতন্ত্র অংশীদারসহ তাদের ১৯৯টি আসন রয়েছে। 'জাপান ইনোভেশন পার্টি'র সঙ্গে জোট করে বর্তমানে তারা একটি নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে।
প্রয়াত রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অনুসারী এবং মার্গারেট থ্যাচারের ভক্ত হিসেবে পরিচিত তাকাইচি জাপানে 'আয়রন লেডি' নামে পরিচিত। বছরের পর বছর স্থবিরতার পর তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তিনি অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফেরাতে সরকার-চালিত বিশাল ব্যয়ের পক্ষে যা শিনজো আবের 'অ্যাবেনোমিক্স'-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসেই তার ব্যক্তিগত জনসমর্থন আকাশচুম্বী হয়েছে, ২০১২ সালে আবের পর আর কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রী এত জনপ্রিয় হননি।
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতাকে টোকিও 'সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ' হিসেবে বর্ণনা করার প্রেক্ষাপটে গত ডিসেম্বরে তাকাইচির মন্ত্রিসভা রেকর্ড ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৫৭ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করে। গত নভেম্বরে তাইওয়ান ইস্যুতে মন্তব্য করে তিনি চীনের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, চীন যদি তাইওয়ান আক্রমণ করে তবে জাপান তার সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স দিয়ে এর জবাব দিতে পারে। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অবনতি ঘটে।
অন্যদিকে, তাকাইচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাপান সফরের সময় দুই নেতা একে অপরের ব্যাপক প্রশংসা করেন এবং বিরল খনিজ সম্পদ নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সম্পর্কের এক নতুন 'স্বর্ণযুগ' শুরুর ঘোষণাও দেন।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, জাপানিদের মধ্যে তার দল এলডিপি অজনপ্রিয় থাকলেও তাকাইচি এবং তার সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ৬০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে। শিযুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিজিরো তাকেশিতা বিবিসিকে বলেন, এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই তাকাইচি পার্লামেন্টে এলডিপির 'একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা' নিশ্চিত করতে চান এবং সাহসী নীতিগুলো সহজে বাস্তবায়ন করতে চান।
তবে এই আগাম নির্বাচনের বাজি ধরায় ঝুঁকিও রয়েছে। এলডিপির নেতৃত্ব বর্তমানে নড়বড়ে অবস্থানে এবং তাকাইচি গত পাঁচ বছরে দেশটির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। তার পূর্বসূরিদের মেয়াদ কেলেঙ্কারি ও জনসমর্থন হ্রাসের কারণে সংক্ষিপ্ত হয়েছিল। তার ঠিক আগের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবাও দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন, যার ফলে এলডিপি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।
এছাড়া গত সপ্তাহে জাপানের বৃহত্তম বিরোধী দল 'কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ জাপান' এবং এলডিপির সাবেক জোটসঙ্গী 'কোমিতো' মিলে 'সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স' নামে একটি নতুন শক্তিশালী বিরোধী জোট গঠন করেছে।
তাকাইচি অবশ্য দাবি করেছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে এমন অর্থনৈতিক নীতিগুলোতে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না তা নিশ্চিত করার জন্য একটি 'পুরোপুরি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর' পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
টেম্পল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. জেফরি কিংস্টন বিবিসিকে বলেন, তাকাইচি আশা করছেন 'মানুষ তার প্রতিশ্রুতি পূরণে তার ওপর আস্থা রাখবে।' তার বিপুল জনসমর্থন হয়তো সামনে কমতে শুরু করবে, তাই তিনি এই মধুর সময়ের সুফলগুলো এখনই ঘরে তুলতে চাইছেন।
